![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বকাপে নিজেদের দল বিদায় নেওয়ার পর সাধারণত প্রতিবেশী কোনো দেশকে সমর্থন করার প্রবণতা দেখা যায়। ইউরোপ কিংবা আফ্রিকার অনেক দেশেই এমন চিত্র পরিচিত। তবে লাতিন আমেরিকায় এবার ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। টুর্নামেন্টে অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর বড় একটি অংশ তাদের সমর্থন না করে বরং পরাজয় দেখতে আগ্রহী।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করার পর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলম্বিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, মেক্সিকো ও ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের অনেক সমর্থক প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, তারা আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষকেই সমর্থন করবেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য মিমে দাবি করা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা নিজেকে লাতিন আমেরিকার অংশের চেয়ে ইউরোপের কাছাকাছি ভাবতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং রাজনৈতিক-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব। আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার বড় অংশ ইউরোপীয় অভিবাসীদের বংশধর হওয়ায় দেশটিতে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে প্রতিবেশী অনেক দেশের মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে, আর্জেন্টিনা প্রায়ই নিজেদের অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি লিওনেল মেসির নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি তাদের কিছু সমর্থকের বিতর্কিত আচরণও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন ম্যাচে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের উদ্দেশে বর্ণবাদী মন্তব্য এবং অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
মেক্সিকোর একাধিক সমর্থক জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনার ফুটবল দক্ষতার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা থাকলেও কিছু সমর্থক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের বক্তব্য তাদের বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করেছে। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের অনেক সমর্থকের কাছ থেকেও। তাদের মতে, আর্জেন্টিনার কিছু অংশের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি সম্মানবোধের ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার অনেক বিশ্লেষক ও নাগরিক এই সমালোচনাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। তাদের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তির মন্তব্য বা আচরণের জন্য পুরো জাতিকে দায়ী করা ঠিক নয়। তারা মনে করেন, আর্জেন্টিনা মূলত একটি বহুসাংস্কৃতিক লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ঐতিহ্য থাকলেও দেশটির পরিচয় লাতিন আমেরিকার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আর্জেন্টাইন সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক মার্তিন কোহানের ভাষায়, আর্জেন্টিনা কখনোই শুধু ইউরোপীয় পরিচয়ের দেশ নয়। বরং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র। রাজধানী বুয়েনস আইরেসের ইউরোপীয় আবহ পুরো দেশের বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে সব সমর্থক যে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, এমনটিও নয়। বিশেষ করে লিওনেল মেসির জনপ্রিয়তার কারণে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এখনো অসংখ্য মানুষ আর্জেন্টিনার জার্সি পরে দলটির সাফল্য কামনা করছেন। অনেকের মতে, ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও মেসির অসাধারণ ক্যারিয়ার ও আর্জেন্টিনার নান্দনিক ফুটবল উপভোগ করেন বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক।
ফাইনালের আগে তাই মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার ফুটবল সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আর্জেন্টিনা শিরোপা জিততে পারবে কি না, সেটি যেমন বড় প্রশ্ন; তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বও বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।
পাঠকের মন্তব্য