![]()
বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) আজ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এ এফএও-এর টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম (TCP)-এর ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে। পাঁচ দশকের এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা (Agrifood Systems) শক্তিশালী করতে এবং লক্ষ লক্ষ কৃষক, মৎস্যজীবী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
জাতীয় এই উদযাপন অনুষ্ঠানে এফএও-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত পাঁচটি নতুন কারিগরি সহযোগিতা উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। এর মাধ্যমে উদ্ভাবন, কারিগরি উৎকর্ষ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উদীয়মান কৃষি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ও এফএও-এর যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, প্রধান অতিথি হিসেবে। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল আই. মোহাম্মদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ উইং-এর প্রধান একেএম সোহেল, এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পিপিসি) ড. মো. মাহমুদুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুস সালাম। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে এফএও-এর প্রতিনিধি জিয়াওচুন শি। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এফএও-এর টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম (TCP) সংস্থাটির অন্যতম প্রধান কর্মসূচি, যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে দ্রুত, চাহিদাভিত্তিক কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। গত পাঁচ দশকে এই কর্মসূচি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রমাণভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। এসব উদ্যোগ পরবর্তীতে বৃহত্তর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বব্যাপী গত ৫০ বছরে ১৭৮টি সদস্য দেশে ১১,০০০-এরও বেশি প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে TCP। বর্তমানে প্রতি দুই বছর অন্তর (biennium) প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি নতুন TCP প্রকল্প অনুমোদিত হয়, যা এফএও-এর অন্যতম দ্রুত সাড়া প্রদানকারী কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে এই কর্মসূচি গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষি রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
১৯৭৩ সাল থেকে এফএও বাংলাদেশে ৩৮০টিরও বেশি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যার মোট আর্থিক মূল্য ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান গঠন, নীতিমালা শক্তিশালীকরণ এবং লক্ষ লক্ষ কৃষক, মৎস্যজীবী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় নীতি উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনেও TCP গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মাননীয় উপদেষ্টা মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন,
“বাংলাদেশের কৃষি খাতের রূপান্তর শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব এবং বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম আমাদের আরও সহনশীল, উৎপাদনশীল ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”
এফএও-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিয়াওচুন শি বলেন,
“টেকনিক্যাল কো-অপারেশন প্রোগ্রাম সদস্য দেশগুলোর অগ্রাধিকার অনুযায়ী সময়োপযোগী ও চাহিদাভিত্তিক কারিগরি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এফএও-এর অঙ্গীকারের প্রতিফলন। গত পঞ্চাশ বছরে TCP ধারণাকে বাস্তব কর্মে এবং কারিগরি জ্ঞানকে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের প্রভাবে রূপান্তরিত করেছে।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় প্রণীত এফএও-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত পাঁচটি নতুন উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন।
অনুষ্ঠানে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং কৃষক প্রতিনিধিরা TCP-এর মাধ্যমে উদ্ভাবন প্রবর্তন, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কর্মসূচিটির অবদান তুলে ধরেন। কারিগরি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ উইং-এর প্রধান একেএম সোহেল। বক্তারা উল্লেখ করেন, পরিবর্তিত অগ্রাধিকার ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় TCP-এর নমনীয়তা এবং কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে বৃহত্তর উন্নয়ন বিনিয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কৃষক, গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদেরও সম্মান জানানো হয়।
বাংলাদেশ যখন তার জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সরকার ও এফএও উন্নত উৎপাদন, উন্নত পুষ্টি, উন্নত পরিবেশ এবং সবার জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পাঠকের মন্তব্য