
ইবি রিপোর্ট
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ‘লংমার্চ কর্মসূচি’ সম্পন্ন করার পর লাভ-ক্ষতির হিসাব খতিয়ে দেখছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। দেশের সাধারণ জনগণ বিরোধীদলীয় এই কর্মসূচিকে কীভাবে দেখছে, তার খোঁজও নিচ্ছে আয়োজকরা। সরকারবিরোধী আন্দোলনের এই প্রথম কর্মসূচিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছে বিএনপি এবং সরকারপক্ষীয় বিভিন্ন দলও। তবে সংসদ চলার সময় পূর্বঘোষিত ৬ দফার সঙ্গে আরও এক দফা যুক্ত করে মোট ৭ দফা দাবিতে ‘লংমার্চ’ করে মাঠ গরম করার এই কার্যক্রমকে সরকার ভালোভাবে নিচ্ছে না।
এ ধরনের কর্মসূচির আসল মতলব নিয়ে সংশয় দানা বেঁধেছে ক্ষমতাসীনদের মনে। সংসদের ভেতরেই আলোচনার মাধ্যমে বিরোধী জোটের উত্থাপিত দাবিগুলোর সমাধান করা যেত বলে মনে করছেন বিএনপিদলীয় মূল্যায়নকারীরা। মাত্র ছয় মাস বয়সী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে মাঠ গরম করার এই আয়োজন জনমনে নানা সংশয় ও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও।
সংসদ বাদ দিয়ে মাত্র ছয় মাসের মাথায় রাজপথে লংমার্চের নামে বিরোধী দল গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধÑ এই ছয় দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিরোধী জোট। তবে গত শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আয়োজিত লংমার্চ পূর্ব সমাবেশে ছয় দফার সঙ্গে সপ্তম দফা যোগ করেন জোটের শীর্ষ নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। নতুন দাবিটি হলোÑ কোনো চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বরদাশত করা হবে না।
ডিসেম্বরে চিড়া-মুড়ি নিয়ে ঢাকায় আসার আহ্বান! লংমার্চকেন্দ্রিক ৫টি পথসভা ও দুটি সমাবেশসহ মোট ৭টি জনসমাগমে একাধিক বক্তা সরকারকে বিরোধী জোটের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তা না হলে এই ৭ দফা সরকার পতনের এক দফায় পরিণত হবে। এ সময় নভেম্বরে ঢাকায় পূর্বনির্ধারিত সমাবেশের কর্মসূচি রাখা হলেও ডিসেম্বরে চিড়া-মুড়ি সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ঐক্যের নেতারা নিজেদের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচিতে সরকার পতনের ‘এক দফার’ ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ‘বাধ্য’ করবেনÑ এমন অঙ্গীকারের কথাও জানিয়েছেন। ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চের পর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখেও লংমার্চ করবে ১১-দলীয় ঐক্য।
এদিকে পর্যবেক্ষক মহলের মতে, দেশে সাম্প্রতিক সংকটগুলো বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জোটের উচিত ছিল সংসদে আলোচনার ভিত্তিতে সংকটের সমাধান করা। অথচ সংসদকে পাশ কাটিয়ে রাজপথে নেমে মাঠ গরম করার নামে উল্টো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারকে ভয় দেখানোর যে সংস্কৃতির পথে বিরোধী জোট হাঁটছে, ডিসেম্বরের মধ্যে এক দফার আন্দোলনে সরকার উৎখাতের যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা সরকার কেন দেশবাসীও ভালোভাবে নিচ্ছে না। তাদের মতে, এতে সরকারের সঙ্গে বিরোধী জোটের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। তা ছাড়া মানুষ এখন আন্দোলনমুখী নয়। তারা সরকারকে পরিকল্পনামাফিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে চায়, সরকারের কাজ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখতে চায়।
বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছে যে, সরকারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এ ধরনের কর্মসূচির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, এ সময়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা কতটুকু এবং এসব দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত কি না। বিরোধী দল সত্যিই কঠোর আন্দোলনের দিকে যাবে, নাকি হুমকি দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে চাইছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, বিরোধী দলের এ কর্মসূচিকে ‘লংমার্চ’ না বলে ‘রোডমার্চ’ বলা উচিত। কারণ এতে কিছু গাড়ি ও নিজস্ব নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ মানুষের তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু বিরোধী দল এখনই কেন এতটা অতিউৎসাহী আচরণ করছে, তা বোধগম্য নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১১-দলীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও পুরো লংমার্চের আয়োজক ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামী। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নানা পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে জামায়াতে ইসলামী লংমার্চ কর্মসূচিকে সফল করেছে। যদিও অনেকের ভাষ্য অনুযায়ী সরকারের সহায়তাতেই বিরোধী জোট এই কর্মসূচি করেছে। কারণ কর্মসূচি শুরুর আগেই এটি সফল করতে একাধিকবার জোটের শীর্ষ পযায় থেকে সরকারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতে সমূহ সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এই লংমার্চে জামায়াতের চেয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টিÑ এনসিপি বেশি সুফল পেয়েছে। তারা জামায়াতের ছায়াতলে থেকে সুবিধা নিয়েছে, জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। গোটা কর্মসূচিতে এনসিপির নেতারা বিভিন্ন স্থানে নির্বিঘ্নে বক্তব্য দেওয়াসহ জনগণের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ লাভ করেছেন। এতে এনসিপিরই রাজনৈতিক লাভ বেশি হয়েছে।
লংমার্চের নামে বিরোধী দল গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা করছে: রিজভী
সংসদ বাদ দিয়ে নতুন সরকারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় রাজপথে লংমার্চের নামে বিরোধী দল গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিরোধী দল রাজপথে লংমার্চের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার করছে। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিলে বিরোধী দল বিষয়টিকে ‘দমন-পীড়ন’ হিসেবে আখ্যা দেবে, এমন পরিকল্পনা থেকেই এটি করা হচ্ছে। গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায়ই এটি করা হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল রাজপথে কেবল সমালোচনাই করে যাচ্ছে, সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট ও গঠনমূলক কোনো প্রস্তাব তুলে ধরছে না। তারা দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিসহ সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক অর্জনগুলোকে তারা জনগণের সামনে আড়াল করার চক্রান্তে লিপ্ত।’
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘সরকার ব্যর্থ হয়েছেÑ এমন দাবি তুলে বিরোধীরা রাজপথে আন্দোলন করে বেড়ালেও দেশের সাধারণ জনগণ তাদের এই ভূমিকা ইতিবাচকভাবে দেখছে না। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের মতো সংসদে নিজেদের দাবি বা প্রস্তাব উত্থাপন না করে রাজপথের বিশৃঙ্খলা বেছে নেওয়াই প্রমাণ করে, তারা মূলত সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
জামায়াতের কৃতজ্ঞতা ও দুঃখ প্রকাশ
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিৃবৃতিতে ১১-দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী শান্তিপূর্ণ লংমার্চ সফল করায় জনগণের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি লংমার্চ কর্মসূচির কারণে সাময়িক ভোগান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ