![]()
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এটি যেমন দেশের সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তেমনি সামনে নিয়ে আসছে কঠিন প্রতিযোগিতা ও নতুন বাস্তবতা। শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে, আন্তর্জাতিক মান ও পরিবেশগত শর্ত আরও কঠোর হবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ অর্থায়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বেসরকারি খাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। আগামী এক দশক হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগই এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত করতে পারে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসা সহজীকরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এটিকে ধরে রাখতে হলে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; ওষুধ, কৃষি, মৎস্য, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যের দিকে জোর দিতে হবে। তিনি জানান, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য, ব্যবসা সহজীকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, আধুনিক কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং শিল্প গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে না পারলে এলডিসি উত্তরণের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে এখন শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না; পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশগত মান এবং টেকসই উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই সবুজ অর্থায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্স, শিল্পে সবুজ প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগে নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হতে হবে। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কর ও শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, দ্রুত কাস্টমস সেবা, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সামনে বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ইউরোপসহ প্রধান বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলা, ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধি মানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সবুজ অর্থায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, এফটিএ ও পিটিএ বাস্তবায়ন, জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণ ও কর সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সিএসইআরের চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম তাঁর ‘এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: সরকারের করণীয়, বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তবে এই অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা। কারণ এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসবে। তাই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেই মর্যাদাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে আরও তিন বছর প্রস্তুতির সময় দিয়েছে। এই সময়কে অতিরিক্ত অবকাশ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে ভবিষ্যতের অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণে কাজে লাগাতে হবে। সুস্পষ্ট জাতীয় উত্তরণ কৌশল, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত যদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে সমান গুরুত্ব দেয়, তাহলে এলডিসি-পরবর্তী ধাক্কা সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কোনো গন্তব্য নয়, বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা। এই যাত্রায় সফল হতে আগামী তিন বছরকে সংস্কার, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে।
পাঠকের মন্তব্য