![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সপ্তাহের শুরুতেই অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার দাবি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির খবরে বিশ্ববাজারে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার, শেয়ারবাজার, বন্ড মার্কেট এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে।
সোমবার সকালে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজার নিম্নমুখী অবস্থায় লেনদেন শুরু করে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বেড়ে যায়, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তেলের বাজারে বড় উল্লম্ফন
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও একই হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি বেড়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে দ্রুত অস্থির করে তোলে।
শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ
তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। ফলে এশিয়ার বেশিরভাগ শেয়ারসূচক দিনের শুরুতেই নিম্নমুখী ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০, নাসডাক এবং ইউরোপীয় প্রধান সূচকগুলোর ফিউচারেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
জাপানের নিক্কেই সূচক টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এছাড়া এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকও নিম্নমুখী অবস্থানে রয়েছে।
ডলার ও বন্ডের চাহিদা বেড়েছে
ভূরাজনৈতিক সংকট বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মার্কিন ডলারের মূল্য শক্তিশালী হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ট্রেজারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে। ফলে দুই বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাজারে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতিও আবার বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ভবিষ্যতে সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে।
নজরে ফেড চেয়ারম্যান ও মূল্যস্ফীতির তথ্য
বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচকের দিকে। মঙ্গলবার ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেবেন। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্যও প্রকাশ করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম কিছুটা কমে আসায় জুন মাসের মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমতে পারে। তবে নতুন করে তেলের দাম বাড়তে শুরু করায় সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
করপোরেট আয় প্রতিবেদনের দিকেও নজর
এই সপ্তাহে বিশ্বের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু হবে। মঙ্গলবার মার্কিন ব্যাংকগুলো চলতি প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে। এরপর নেটফ্লিক্স, জেনারেল ইলেকট্রিকসহ আরও কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের আয় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, করপোরেট মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হলে বিশ্ববাজারের বর্তমান উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদি আশাবাদ
বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে সাময়িক অস্থিরতা থাকলেও এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এখনও শক্তিশালী। ভালো মুনাফা ও তুলনামূলক আকর্ষণীয় মূল্যায়নের কারণে প্রযুক্তি খাত ভবিষ্যতেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রেই থাকবে বলে মনে করছেন তারা।
তেলের দাম কোথায় গিয়ে থামতে পারে?
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেবের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে অবস্থান করবে। যদিও মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা হতে পারে, তবুও বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে আইজি গ্রুপের বাজার বিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও তেলের দাম খুব দ্রুত ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করবে—এমন সম্ভাবনা এখনও সীমিত। তবে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী, জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে। কারণ হরমুজ প্রণালির যেকোনো অস্থিতিশীলতা শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক বাজারের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য