ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) জনপ্রিয় হওয়ার পর এআই প্রশিক্ষণ বা ডেটা অ্যানোটেশন খাতের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের হাজারো ফ্রিল্যান্সারও এখন যুক্ত হয়েছেন বৈশ্বিক এআই শিল্পে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। তারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রেখেছেন। এছাড়া ২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে ছিল, যা আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং খাতে দেশের শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রমাণ।
এআই ট্রেইনার বা ডেটা অ্যানোটেটরের কাজ কী?
চ্যাটজিপিটির মতো আধুনিক এআই মডেলগুলোকে আরও নির্ভুল, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন হয় মানুষের তত্ত্বাবধান। এই কাজই করেন ডেটা অ্যানোটেটর বা এআই ট্রেইনাররা।
তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা, ভুল উত্তর শনাক্ত করা, কনটেন্ট লেবেলিং, ছবি ও অডিও ট্যাগিং, চ্যাটবটের উত্তর মূল্যায়ন এবং এআই যেন ক্ষতিকর বা বিভ্রান্তিকর তথ্য না দেয়, তা নিশ্চিত করা।
এছাড়া রেড-টিমিংয়ের মাধ্যমে এআইকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয়, যাতে দুর্বলতা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
দ্রুত বাড়ছে বৈশ্বিক বাজার
গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্রেটস রিসার্চ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ডেটা অ্যানোটেশন টুলস বাজারের আকার ছিল প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে এই বাজার ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ৪৩ কোটি মানুষ এআই প্রশিক্ষণ, কনটেন্ট রিভিউ ও ডেটা লেবেলিংয়ের মতো কাজে যুক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশের সামনে যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং প্রযুক্তিবান্ধব তরুণদের কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক এআই আউটসোর্সিং বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে শুধু সাধারণ ডেটা লেবেলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাবিল মোহাম্মদের মতে, এআই ডেটা অ্যানোটেশন অনেকটা বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতের মতো হলেও এখানে উচ্চতর প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নতমানের এআই পণ্য ও সেবা তৈরিতে সক্ষম না হলে বাংলাদেশ কেবল স্বল্পমূল্যের আউটসোর্সিং বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মজুরি বৈষম্য ও অটোমেশনের ঝুঁকি
বিশ্ববাজারে ডেটা অ্যানোটেশনের চাহিদা বাড়লেও কর্মীদের মজুরিতে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করা কর্মীরা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম পারিশ্রমিক পান।
একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে বর্তমানে মানুষ যেসব সাধারণ কাজ করছেন, সেগুলোর বড় অংশ ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এআই নিজেই করতে পারবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে কেবল সাধারণ দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দক্ষতা বাড়ালেই মিলবে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ডেটা লেবেলিংয়ের পরিবর্তে রেড-টিমিং, এআই পলিসি, মডেল মূল্যায়ন, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ও আয়—দুই-ই বাড়বে।
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা এবং স্থানীয় এআই পণ্য উন্নয়নে গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশ শুধু এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং বৈশ্বিক এআই সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাত বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর কাজের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার বিকল্প নেই।