![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইউক্রেন যুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সেনা ক্ষতি সামাল দিতে এবার বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করছে রাশিয়া। ড্রোন অপারেটর হিসেবে তুলনামূলক নিরাপদ দায়িত্ব, মোটা অঙ্কের বেতন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের নিয়োগ করা হলেও বাস্তবে অনেককে পাঠানো হচ্ছে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে। ইতোমধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় এই কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
২৩ বছর বয়সী ভ্যালেরি অ্যাভেরিন তিন মাস ধরে ড্রোন অপারেটর হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তাকে ড্রোন ইউনিটে না রেখে সামনের সারির যুদ্ধে পাঠানো হয়। পরে ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলের কাছে মর্টার হামলায় নিহত হন তিনি।
অ্যাভেরিনের পালক মা অকসানা আফানায়েভা অভিযোগ করেন, তার ছেলে কখনো পেশাদার সেনাসদস্য ছিলেন না। ড্রোন পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও তাকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “সে তিন মাস ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। তারপরও তাকে মৃত্যুকূপে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”
রাশিয়ার চলতি বছরের শুরুতে চালু হওয়া নতুন নিয়োগ কর্মসূচির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনিক্যাল কলেজ ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এক বছরের চুক্তিতে ‘আনম্যানড সিস্টেমস ট্রুপস’ বা ড্রোন বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
প্রচারপত্রে ড্রোন ইউনিটকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং তুলনামূলক নিরাপদ শাখা হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অ্যাভেরিনের মতো একই পরিণতি হয়েছে আরও দুই শিক্ষার্থীর। রেলওয়ে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করা ১৮ বছর বয়সী ভ্লাদিস্লাভ গোরবুনভ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার মাত্র চার মাসের মাথায় নিহত হন। প্রথমে তাকে পদাতিক বাহিনীতে এবং পরে ড্রোন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ওয়েল্ডিং শিক্ষার্থী রাখিম আবদুলিনও নিরাপদ দায়িত্বের আশায় ড্রোন অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই যুদ্ধে প্রাণ হারান।
তার মা এলেনা বলেন, “ড্রোন অপারেটরের কাজ নিরাপদ হবে ভেবেই ছেলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারাও সামনের সারির অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।”
বিবিসির রুশ বিভাগ, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৭ জন রুশ সেনাসদস্যের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা গেছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার থেকে ৫ লাখ ৯ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ-ও সম্প্রতি জানিয়েছে, রাশিয়ার নিহত সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫৫ হাজার সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেন। বিভিন্ন স্বাধীন বিশ্লেষণে ইউক্রেনের সামরিক হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলৌসভ ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঘোষণা দেন, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ড্রোন বাহিনীতে মূলত ৩৫ বছরের কম বয়সীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কারণ তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম।
এরপর থেকেই দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ব্যাপক নিয়োগ প্রচারণা শুরু হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মোটা অঙ্কের বেতন, সরকারি সহায়তায় উচ্চশিক্ষা, উন্নত আবাসন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের অভিযোগ, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ২০২২ সালে আংশিক সেনা সমাবেশ ঘোষণার পর অধিকাংশ সামরিক চুক্তির মেয়াদ কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হচ্ছে। ফলে এক বছর শেষে পড়াশোনায় ফেরার প্রতিশ্রুতিও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯২০ জন রুশ ড্রোন অপারেটর যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি, নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী সেনাবাহিনীতে পাঠানোর কোটা নির্ধারণ এবং চুক্তিতে সই না করলে অপমান করার অভিযোগও সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সেনা সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। সেই ঘাটতি পূরণে এবার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। নিরাপদ প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ক্যারিয়ারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক তরুণকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে, যা এই কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।