![]()
আহমেদ তোফায়েল
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে। এই বোঝা কমাতে বড় ছাড় ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন খেলাপিরা ঋণের মূল টাকা এককালীন পরিশোধ করলেই দায়মুক্তি পাবেন। অর্থাৎ, ঋণের ওপর জমে থাকা কোনো সুদ তাদের আর দিতে হবে না। এমনকি ব্যাংকের নিজস্ব ‘তহবিল ব্যয়’ আদায়ের নিয়মও এবার শিথিল করা হয়েছে।
তবে এই বিশেষ সুবিধা সব সময়ের জন্য নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের মূল টাকা একসঙ্গে ব্যাংকে জমা দিতে হবে। দেশের সব ব্যাংকে ইতিমধ্যে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকের নগদ টাকার সংকট কাটাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে উৎপাদনশীল খাতে নতুন করে ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই অর্থনীতি ও ব্যবসায়ী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নগদ সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর জন্য এটিকে ইতিবাচক মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী সৎ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর।
বিষয়টি আসলে কী?
সহজ কথায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের জন্য একটি বিশেষ ক্ষমার সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু খেলাপি তাদের ঋণের সমস্ত সুদ মাফ করিয়ে নিতে পারবেন। তবে শর্ত একটাই—তাদের ঋণের মূল বা আসল টাকাটা একসঙ্গে ব্যাংকে ফেরত দিতে হবে।
ব্যাংকিং নিয়মে কোনো ঋণের কিস্তি এক বছর বা তার বেশি পার হয়ে গেলে সেটিকে ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ঋণ বলা হয়। ২০২৬ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে ব্যাংকের খাতায় যারা এই ‘মন্দ’ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, কেবল তারাই এই সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। বিগত সরকারের আমলে নানান অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবে এই ঋণের বড় অংশ বিতরণ করা হয়েছিল। সেই টাকা এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে থাকায় দেশের ব্যাংকগুলোতে তীব্র নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, অনেক ব্যাংক সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকা ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। এই অচলাবস্থা থেকে ব্যাংকিং খাতকে বাঁচাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বড় ছাড় দিয়েছে।
সুবিধাটি যারা পাবেন:
এই সুবিধা ঢালাওভাবে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন, ঋণগ্রহীতাকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে আবেদন করতে হবে। এরপর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গ্রাহকের অতীত রেকর্ড দেখে এটি অনুমোদন করবে। যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে বা প্রকৃত আর্থিক সংকটে পড়ে ব্যবসা চালাতে পারছেন না, কেবল তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ছোট কৃষক, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের স্বল্পমেয়াদি ঋণগ্রহীতাদের এই সুবিধা সবার আগে নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে নীতিগতভাবে ছোট-বড় সব খেলাপিই এই সুযোগের আওতায় আসতে পারবেন।
নেপথ্যের কারণ ও শর্ত শিথিলতা
এর আগে ২০২২ সালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ মওকুফের একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে তখন ব্যাংকের ‘তহবিল ব্যয়’ বা কস্ট অব ফান্ড আদায়ের বাধ্যবাধকতা ছিল। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে শর্ত ছিল আরও কঠোর।
বর্তমান চরম সংকটের কারণে এবার আগের সেই কঠোর শর্ত দুটি তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকই তাদের খেলাপিদের সুদ মওকুফ করতে পারবে। এর মূল লক্ষ্য হলো—অন্তত মূল টাকাটা যেন দ্রুত ব্যাংকে ফেরত আসে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন প্রকৃত লোকসানে পড়া ব্যবসায়ীরা। তারা মূল টাকা ফেরত দিয়ে ব্যবসা সচল করার সুযোগ পাবেন। ব্যাংকগুলোও তাদের অনাদায়ী টাকা ফেরত পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পাবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের একটি বড় নেতিবাচক দিক রয়েছে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ব্যবসায়ীরা একে ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করছেন। ঢাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা যারা ঠিক সময়ে সুদের টাকাসহ ঋণ পরিশোধ করছি, তাদের কোনো পুরষ্কার দেওয়া হচ্ছে না। অথচ যারা বছরের পর বছর টাকা আটকে রাখলেন, তাদের উল্টো সুদ মাফ করা হচ্ছে। এটি সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য হতাশাজনক।’
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ আদায় করা সম্ভব হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাংকগুলোর নগদ টাকার সংকট কমবে। সেই টাকা বাজারে নতুন ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা যাবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে সাধারণ আমানতকারীদের মনেও আস্থা ফিরে আসবে। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। সুদের আয়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকগুলো চলে। ঢালাওভাবে সুদ মাফ করা হলে ব্যাংকের নিজস্ব আয়ের খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিগুলো কী কী?
এই বিশেষ ক্ষমার পেছনে তিনটি বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। যেমন-
১. প্রভাবশালী বড় বড় খেলাপিরা চাপ সৃষ্টি করে এই সুযোগ হাতিয়ে নিতে পারে।
২. এই সুযোগের ফলে বাজারে একটি ভুল বার্তা যেতে পারে যে, ঋণ পরিশোধ না করে বসে থাকলে একসময় সুদ মাফ পাওয়া যায়। এর ফলে নিয়মিত গ্রাহকরাও ভবিষ্যতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।
৩. বিগত সরকারের সুবিধাভোগী অনেক বড় খেলাপি ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে এই নীতি কতটুকু কাজ করবে, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির ওপর। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর এবং ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই সুযোগের সময়সীমা (৩১শে ডিসেম্বর) কোনো অবস্থাতেই বাড়ানো যাবে না।
একই সাথে, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে—এটিই শেষ সুযোগ। এই সময়ের মধ্যে যারা মূল টাকা ফেরত দেবে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সৎ ব্যবসায়ীদের যাচাই করে এই সুবিধা দেওয়া উচিত, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে নয়।
লেখক: আহমেদ তোফায়েল,
বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
এর আগে তিনি দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও ইত্তেফাকে কাজ করেছেন।