![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
আজ থেকে নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭ শুরু হলো। প্রতিবছর জুন মাস এলে সাধারণ মানুষের চোখ থাকে সংসদের দিকে। নতুন বাজেট জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সবাই ভাবেন। কোন জিনিসের দাম বাড়বে বা কমবে, সেই হিসাব শুরু হয়। এবারও বাজেট পাসের আগে কিছু প্রস্তাব সংশোধন করা হয়েছে। যেমন, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি বাতিল হয়েছে। এটি সাধারণ মানুষের বড় দুশ্চিন্তা দূর করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই বাজেট কতটা স্বস্তি দেবে, তা বিশ্লেষণ করা দরকার।
করমুক্ত আয়সীমা: মধ্যবিত্তের স্বস্তি
উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি খুব ভালো ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আগে করমুক্ত আয়সীমা ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রী এটি পৌনে চার লাখ করার প্রস্তাব করেছিলেন। পরে শেষ মুহূর্তে তা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়।
বিগত কয়েক বছরে সংসার খরচ অনেক বেড়েছে। এই অবস্থায় নতুন সিদ্ধান্ত সীমিত আয়ের মানুষকে সাহায্য করবে। এখন বার্ষিক আয় চার লাখ টাকার কম হলে কোনো কর দিতে হবে না। এর চেয়েও বড় খবর হলো, পরবর্তী এক লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ করের স্তরটি তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত করদাতারা সরাসরি উপকৃত হবেন। তবে ন্যূনতম কর ৫ হাজার টাকা বহাল রাখা হয়েছে।
অনলাইন রিটার্ন: ডিজিটালাইজেশনের সুফল:
কর ব্যবস্থায় এবার বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে এর সঙ্গে কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে করছাড় পাওয়া যাবে। এই ছাড়ের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কোনো ছাড় বা জরিমানা থাকবে না। কিন্তু জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে রিটার্ন দিলে জরিমানা গুনতে হবে।
পাঁচটি বিশেষ শ্রেণি ছাড়া সবার জন্য অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ কর প্রশাসনের হয়রানি কমাবে। শেষ সময়ে কর অফিসে দীর্ঘ লাইন আর থাকবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল হওয়ায় মানুষের হস্তক্ষেপ থাকবে না। তবে অনেক করদাতার প্রযুক্তিগত দক্ষতা কম। তাই অনলাইন সিস্টেমটি সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন রাখা জরুরি।
সঞ্চয়পত্রের অগ্রিম কর:
বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার অগ্রিম কর নিয়ে নতুন নিয়ম করা হয়েছে। এখন থেকে এই কর চূড়ান্ত কর দায় নয়। বছর শেষে এটি করদাতার মোট করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। বাড়তি কর কেটে রাখা হলে তা ফেরত পাওয়া যাবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো নিয়ম। কিন্তু এর ভেতরে কিছু জটিলতা আছে। বাংলাদেশে অনেকেই সামাজিক নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয়পত্র কেনেন। ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন লাগে। যারা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং যাদের করযোগ্য আয় নেই, তারা এত দিন টিআইএন ছাড়াই বিনিয়োগ করতেন।
এখন এই অগ্রিম কর ফেরত পেতে হলে তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে টিআইএন নিতে হবে। একই সঙ্গে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে। রিটার্ন জমার পর কর কর্মকর্তারা ১২০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেবেন। আমাদের দেশের কর অফিসের যে বাস্তবতা, তাতে এই টাকা ফেরত পাওয়া বেশ কঠিন হতে পারে। সাধারণ মানুষ ও প্রবীণ ব্যক্তিরা এতে হয়রানির শিকার হতে পারেন।
বড় করদাতাদের ওপর চাপ:
এবারের বাজেটে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা সুবিধা কমানো হয়েছে। নতুন নিয়মে মোট করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটি রেয়াত পাওয়া যাবে। আগে এই রেয়াতের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ১০ লাখ টাকা।
এই পরিবর্তনের ফলে বড় করদাতাদের করের পরিমাণ বাড়বে। উদাহরণস্বরূপ, কারও বার্ষিক আয় ৩ কোটি টাকা হলে তিনি আগের চেয়ে আড়াই লাখ টাকা কম রেয়াত পাবেন। সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এটি ভালো পদক্ষেপ। তবে এটি ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে কিছুটা নিরুৎসাহিত করতে পারে।
স্বাস্থ্য খাত: চিকিৎসায় বড় ছাড়
এবারের বাজেটের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো চিকিৎসা খাতের ছাড়। ক্যানসারসহ ছয়টি দুরারোগ্য ব্যাধির এককালীন ভাতা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। এটি অসহায় পরিবারগুলোর জন্য বড় সাহায্য।
হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য হার্টের রিং আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম কর তুলে নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা খরচ কমবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের পণ্যেও কর কমানো হয়েছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ ও সবার জন্য ‘হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা:
নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (পিএসআর) দেখানোর তালিকা বড় হয়েছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হতেও পিএসআর লাগবে। সব মিলিয়ে ৪১টি সেবার ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া। এমনকি সিটি করপোরেশন এলাকায় কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিতেও এই প্রমাণপত্র লাগবে। করের আওতা বাড়ানোর জন্য এই নিয়ম করা হয়েছে। তবে এই কড়াকড়ি যেন সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা পাওয়ার পথে বাধা না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
তবে রাজস্ব আদায় ও জনকল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যেমন—
অনলাইন রিটার্ন সিস্টেম খুব সহজ করতে হবে। সার্ভার যেন সবসময় সচল থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়পত্রের কর ফেরতের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন।
ওষুধ ও চিকিৎসার পণ্যে যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, তার সুফল যেন রোগীরা পান। এ জন্য বাজারে কঠোর নজরদারি দরকার। ৪১টি সেবায় পিএসআর বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি সবাইকে জানাতে হবে। ব্যাপক প্রচার না হলে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়বেন।
পরিশেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মধ্যবিত্তকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। আবার করের নিয়ম কানুন বাড়িয়ে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করেছে। এই বাজেটের সফলতা নির্ভর করছে এর সঠিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। কর আদায়ের প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তত বাড়বে।
লেখক: জাহিদুজ্জামান সাঈদ
এডিটর -ইন-চিফ ও প্রকাশক
এন্টারপ্রেনার বাংলাদেশ।
পাঠকের মন্তব্য