![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্প বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির নীতিগত পরিবর্তন এবং স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের মতো বিভিন্ন কারণে খাতটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের (ভ্যালু অ্যাডিশন) বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত টেক্সটাইল শিল্পের জন্য নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে দেশীয় উৎপাদন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত বাতিল হওয়ায় অনেক টেক্সটাইল মিল টিকে থাকতে পারবে না। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশীয় শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার আরও বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। তিনি বলেন, একটি টেক্সটাইল মিলকে লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে প্রায় ৯৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতায় চলতে হয়। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক মিল মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত শিল্প
শিল্প মালিকদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে চলমান জ্বালানি সংকট টেক্সটাইল খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিংবা দিনের পর দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
২০২৩ সালে শিল্পখাতে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। নতুন ও সম্প্রসারণাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্যাসের মূল্য আরও বাড়ানো হয়েছে। অথচ উচ্চমূল্য পরিশোধ করেও অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। ফলে তাদের ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এনজেড টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিটিএমএর সাবেক সহ-সভাপতি সালেউধ জামান খান জানান, শুধুমাত্র জ্বালানি সংকটের কারণেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৫০টি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৩৪টি টেক্সটাইল কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
উচ্চ সুদের হারেও বাড়ছে চাপ
শুধু জ্বালানি নয়, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সুদের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক মিল মালিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপি হয়ে পড়েছেন। ফলে নতুন করে চলতি মূলধন সংগ্রহও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
আমদানিকৃত সুতার অপচয় হার নিয়ে বিতর্ক
২০২২ সালে শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত অপচয় হার ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ শতাংশ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে দেশীয় স্পিনিং মিল মালিকদের মধ্যে।
তাদের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রকৃত অপচয়ের হার ১২ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। অতিরিক্ত অপচয় সুবিধার সুযোগ নিয়ে কিছু আমদানিকারক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সুতা এনে দেশীয় বাজারে বিক্রি করছেন, যা স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতীয় সুতার প্রতিযোগিতায় চাপে স্থানীয় শিল্প
খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ভারত সরকার বিভিন্ন ভর্তুকি ও কর সুবিধা দেওয়ায় ভারতীয় সুতা বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
সালেউধ জামান খান বলেন, ভারত গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে সুতা ডাম্পিং করছে। এতে অনেক স্থানীয় উৎপাদক লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতীয় সুতার অন্যতম বৃহৎ বাজারে পরিণত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কমছে স্থানীয় মূল্য সংযোজন
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পে দেশীয় কাপড় ও সুতা ব্যবহারের হার কমে যাওয়ায় স্থানীয় মূল্য সংযোজনও কমছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার নেমে এসেছে প্রায় ৬১ শতাংশে। কয়েক বছর আগেও এই হার ছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত নীতিগত সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে বিটিএমএর সদস্যভুক্ত ১,৭৮০টি মিলের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী শ্রমিক। ফলে শিল্পখাতটির স্থিতিশীলতা শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাঠকের মন্তব্য