![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশের নতুন ঋণ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট এবং সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে করব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং আর্থিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ জানতে আগ্রহী সংস্থাটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফ বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে একটি একক ভ্যাট হার চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণের পাশাপাশি টার্নওভার ট্যাক্স আরোপেরও সুপারিশ করেছে।
তবে সরকার এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারও একক ভ্যাট হার চালুর পক্ষে থাকলেও সেটি ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে রাখতে চায়। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে টার্নওভার ট্যাক্স আরোপের পরিকল্পনা নেই।
তিনি বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ না করলেও টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। কর প্রশাসনের হিসাব ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার পরই এ ধরনের কর আরোপের বিষয়ে ভাবা যেতে পারে। কারণ করদাতার ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব।”
ব্যাংক খাতে বড় সংস্কার চায় আইএমএফ
নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। আইএমএফ খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ এবং ব্যাংক পরিচালনায় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমানোর বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকিং খাত সংস্কারের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট পাস করেছে। তবে নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় একীভূত ব্যাংকের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখার বিষয়ে আইএমএফ আপত্তি জানিয়েছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, আইএমএফকে সন্তুষ্ট করতে এই ধারা বাতিলের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিসেম্বরে হতে পারে নতুন ঋণ চুক্তি
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করে।
সাত কিস্তিতে ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে পঞ্চম কিস্তির পর পরবর্তী অর্থ ছাড় স্থগিত করে আইএমএফ। এর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান বিএনপি সরকার আগের কর্মসূচি বাতিল করে নতুন ঋণ চুক্তির জন্য গত ১ জুন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়।
জানা গেছে, নতুন প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফরে আসবে। তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগামী ১২-১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী ডিসেম্বরেই নতুন ঋণ চুক্তি সই হতে পারে।
বাংলাদেশ কত ঋণ পেতে পারে?
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফে বাংলাদেশের বর্তমান কোটা ১,০৬৬.৬ মিলিয়ন এসডিআর (স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস)। আইএমএফের নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশ তার কোটার সর্বোচ্চ ৪৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সাধারণ ঋণ সুবিধা পেতে পারে।
সেই হিসাবে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ প্রায় ৬.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য। বর্তমানে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ২,৮৮৬.৫৭ মিলিয়ন এসডিআর ঋণ ব্যবহার করছে। ফলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত প্রায় ২.৩২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত ১.৬৮ বিলিয়ন ডলারসহ মোট প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ সুবিধা চাচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ আইএমএফ ঋণ?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের ঋণের অর্থের পরিমাণের চেয়ে এর অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইএমএফের মূল্যায়নকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, দাতা গোষ্ঠী ও বৈদেশিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “আইএমএফ কর্মসূচিতে থাকা মানে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এই ঘাটতি এবং পূর্ববর্তী ঋণ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
এর মধ্যে বাজেট সহায়তা হিসেবে ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলার, জাইকা থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার, এআইআইবি থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে।
তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থের একটি বড় অংশ ছিল পুনর্বিন্যাসকৃত (রি-পারপাজড) ঋণ, যা পূর্বনির্ধারিত প্রকল্প থেকে বাজেট সহায়তায় স্থানান্তর করা হয়েছে।