![]()
ই-বাংলাদেশ প্রদিবেদক
সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ক্রান্তিকালে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে নতুন সরকারের প্রথম এই বাজেটে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই বিশেষ সময়ে সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার এক সাহসী প্রয়াস চালিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে ধান, চাল, গম, আলু, পিঁয়াজ, তেল ও চিনিসহ ৬০টি মৌলিক পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহ এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিকল্পনা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, সুষম উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ার যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বেশ কঠিন। লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা অনেক বেড়ে যাবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি ও ত্রিমুখী কৌশল:
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বাজেট বাস্তবায়নকে কঠিন মনে করলেও মাঠপর্যায়ে সরকারের কঠোর তদারকি বজায় থাকলে এই চ্যালেঞ্জ জয় করা অসম্ভব নয়। তবে লক্ষ্য পূরণে সরকারকে মূলত তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রথমত, কর আদায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্ষমতার চেয়ে মানসিকতার অভাবই বড় বাধা। কর নেটওয়ার্ক বাড়াতে জনগণকে বোঝাতে হবে যে, অর্জিত করের টাকাই দেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়। এই সচেতনতা তৈরিতে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় ভূমিকা রাখতে পারেন।
দুর্নীতি দমন ও অপচয় রোধ:
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমান সংকটকালে এই অপচয়ের ছিদ্রগুলো দ্রুত বন্ধ করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেই নিজের কার্যালয়ের ব্যয় সংকোচন এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মাঠপর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারলে করদাতারাও আশ্বস্ত হবেন এবং রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়বে।
অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার:
বাজেট সুসংহত করার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো অর্থ পাচার রোধ। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা, অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের দেড় বছরের মেয়াদে এই অর্থ উদ্ধারে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, উল্টো তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এখন অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। ফলে বর্তমান সরকারকে বিগত আমলের সব অর্থ পাচারের নিরপেক্ষ তদন্ত করে তা ফেরত আনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন করে যেন কোনো অর্থ পাচার না হয়, সেদিকেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আপাতদৃষ্টিতে এই বাজেট বাস্তবায়নকে যারা অসম্ভব মনে করছেন, তারা বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতাকে খাটো করে দেখছেন। দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে এই ত্রিমুখী কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য। রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় থাকলে এই পথনকশার মাধ্যমেই সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।