![]()
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for Policy Dialogue (CPD)। সংস্থাটির মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাজেট-পরবর্তী এক আলোচনায় সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সরকারের আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, শুধু খাদ্য ও জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতিও প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরও কিছু সময় অব্যাহত রাখতে হতে পারে।
ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি যদি উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা উল্টো মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তার ভাষায়, বড় বাজেট মানেই বড় ব্যয়; কিন্তু সেই ব্যয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা সৃষ্টি না করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সিপিডির মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তাই শুধুমাত্র কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার দক্ষতা বাড়ানোকে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
প্রতিষ্ঠানটি সরকারের মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাস নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছে। মে মাস পর্যন্ত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়ায় অর্থনীতিতে এখনো উচ্চ মূল্যচাপ বিদ্যমান বলে তারা মনে করে।
সিপিডি আরও উল্লেখ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ধীরগতির কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা—এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবুও জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক তেলের দামের অনিশ্চয়তা এখনো বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সিপিডির মতে, চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি যেখানে প্রায় ৫ শতাংশ এবং সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কিছুটা বেশি, সেখানে আগামী বছর এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য অত্যন্ত আশাবাদী।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রাক্কলনকে অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে করছে সিপিডি। বাজেটে আগামী অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত প্রাক্কলন ২১ দশমিক ২ শতাংশ। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করে সংস্থাটি।
একইভাবে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর সরকারি প্রত্যাশা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। কারণ, গত এপ্রিল মাসে এ হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সিপিডির মতে, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি
পাঠকের মন্তব্য