![]()
দেশের অর্থনৈতিক খাত ও শিল্পায়নকে পরিবেশবান্ধব করতে বড় ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এবং মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সংগতি রেখে ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি বিল্ডিং’ এবং ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ খাতে ১ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন আবর্তনশীল পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে গঠিত এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা পাবেন। গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাস্টেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের কাছে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন নীতিমালার আওতায় ইতিমধ্যে ৭০টি পণ্য ও প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন এই সার্কুলারের মাধ্যমে দেশের পরিবেশবান্ধব শিল্প অবকাঠামো নির্মাণে গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। তহবিলটির মেয়াদ হবে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত এবং ঋণের ধরন হবে মেয়াদি। তবে ব্যাংকগুলো ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল সুবিধা দিতে পারবে। এই তহবিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সুদের হার। বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (পিএফআই) মাত্র ২ শতাংশ সুদে এই তহবিল সরবরাহ করবে এবং ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে বা মুনাফায় তা বিতরণ করতে পারবে। এর বাইরে অন্য কোনো অতিরিক্ত ফি বা চার্জ গ্রাহকের ওপর আরোপ করা যাবে না।
নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের সব রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে। তবে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ শর্তারোপ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার অবশ্যই ১০ শতাংশের নিচে হতে হবে। অবশ্য বিশেষ ক্ষেত্রে গ্রাহকের ভালো ট্র্যাক রেকর্ড বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সীমা সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শিথিল করতে পারবে। তহবিল থেকে একক কোনো গ্রাহক বা শিল্প গ্রুপ সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবেন। তবে কোনো ঋণখেলাপি গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠান এই পরিবেশবান্ধব তহবিলের কোনো সুবিধা পাবেন না এবং আবেদন করার আগে গ্রাহকের হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন এই ঋণ সুবিধার অপব্যবহার রোধে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে সার্কুলারে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের সমস্ত ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে। তাছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, স্রেডা এবং কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিশ্চিত করেই কেবল এই ঋণ ছাড় করা যাবে। শুধু তাই নয়, সার্কুলার জারির পর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সবুজ ভবনের সনদ যেমন— লিড বা এজ এর মতো সার্টিফিকেট বা প্রি-সার্টিফিকেট থাকা প্রকল্পগুলোই এই ঋণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যদি কোনো ব্যাংক ভুল তথ্য দেয় বা ঋণের অপব্যবহারের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করাসহ এককালীন পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে।
দেশের শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন অর্থবাজার সংশ্লিষ্টরা। উচ্চ সুদের বাজারে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে সবুজ কারখানা ও শিল্প গড়ার এই সুযোগ দেশীয় রপ্তানিমুখী খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ভারী শিল্প খাতে যারা পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় প্রণোদনা। এই নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পণ্যের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পাঠকের মন্তব্য