
ইবি রিপোর্ট
সারাদিন কাজের ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ পরিচিত কারও নাম মনে না পড়া, কথা বলার সময় কী বলতে চেয়েছিলেন তা ভুলে যাওয়া কিংবা কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত কাজের পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসও এসব সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নিয়মিত গ্লুকোজ, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। ফলে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কী থাকছে, তার প্রভাব মস্তিষ্কের শক্তি, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং রক্তনালীর স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে।
অনেকে ভুলে যাওয়া, মনোযোগের ঘাটতি, মানসিক ক্লান্তি কিংবা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঝিমুনিকে ‘ব্রেইন ফগ’ বলে থাকেন। তবে ব্রেইন ফগ কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘন ঘন অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। এর পর শরীরে হঠাৎ শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার ফলে ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
একইভাবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেও মনোযোগ ও কর্মক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় কাজ বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাস মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।
প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিন এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব শারীরিক সমস্যাও পরোক্ষভাবে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম, বীজ ও মাছ থেকে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ এবং স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট পাওয়া যায়। তাই এসব খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য কোনো একটি খাবারকে আলাদা করে ‘ব্রেইন ফুড’ হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাদিনে কেউ ব্লুবেরি বা আখরোট খেলেন কি না, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা সামগ্রিকভাবে কতটা স্বাস্থ্যকর।
অর্থাৎ শুধু একটি বিশেষ খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করলেই স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগের সমস্যা দূর হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং নিয়মিত সুষম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজ রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২ ও ফোলেটের ঘাটতির সঙ্গে স্নায়বিক ও জ্ঞানীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া আয়রনের ঘাটতিতেও ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। খুব সীমিত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা কিংবা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খাওয়ার ক্ষেত্রে এসব ঘাটতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে শরীরে কোনো পুষ্টির ঘাটতি শনাক্ত না হলে নিজের ইচ্ছায় ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শে ঘাটতি শনাক্ত ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য শুধু খাবার নয়, পর্যাপ্ত পানিও প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় কিংবা গরম আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করলে সতর্কতা ও মনোযোগ কমে যেতে পারে।
তাই সারাদিন নিয়মিত পানি এবং প্রয়োজনীয় তরল পান করার অভ্যাস রাখা জরুরি। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় কাজ বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে শরীরে পানির ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগের সমস্যা হলেই শুধু খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা ঠিক নয়। অপর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তাল্পতা এবং কিছু ওষুধের কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তাই দীর্ঘস্থায়ী ‘ব্রেইন ফগ’ থাকলে এর পেছনে এসব কারণ রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে এর সঙ্গে কোনো শারীরিক বা স্নায়বিক সমস্যা যুক্ত আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা জরুরি হতে পারে।
মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা কোনো ‘ব্রেইন ফগ ডায়েট’ নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি পূর্ণশস্য ও ডালজাতীয় খাবার রাখা যেতে পারে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, মাছ বা ব্যক্তির উপযোগী অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
বাদাম ও বীজ থেকেও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। অন্যদিকে চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস ও পরিশোধিত খাবার কমানো ভালো।
প্রতিটি বেলার খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করলে শরীর ও মস্তিষ্ক—দুটিরই প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা সহজ হয়।
মাঝেমধ্যে ভুলে যাওয়া বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া সবসময় বড় কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। তবে স্মৃতিশক্তির সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিন থাকলে এবং এর সঙ্গে ভাষা, চলাফেরা বা আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ তখন শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, অন্য কোনো শারীরিক বা স্নায়বিক কারণও খুঁজে দেখা প্রয়োজন হতে পারে।
সুতরাং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ভালো রাখতে শুধু কোনো একটি ‘বিশেষ’ খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে একসঙ্গে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পাঠকের মন্তব্য