![]()
বাংলাদেশে অনেকেই Alibaba.com-কে আমাজন বা আলীএক্সপ্রেসের মতো একটি অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মনে করেন। তাই যখন তারা জানতে পারেন যে আলিবাবার বাংলাদেশেও কার্যক্রম রয়েছে এবং ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, তখন অনেকেই অবাক হন। কারণ এখানে সাধারণ ভোক্তারা সরাসরি কেনাকাটা করতে পারেন না। আলিবাবা মূলত একটি বৈশ্বিক বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) প্ল্যাটফর্ম, যেখানে পোশাক, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য বড় পরিসরে পাইকারি ক্রেতা, আমদানিকারক ও আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়।
বাংলাদেশে আলিবাবার ভূমিকা মূলত স্থানীয় রপ্তানিকারক ও উৎপাদকদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আলিবাবা ডটকমের মাধ্যমে বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা প্রায় এক কোটি ডলারের রপ্তানি বাণিজ্য সম্পন্ন করেছেন। পোশাক, হোম টেক্সটাইল, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য ছিল এসব রপ্তানির প্রধান খাত। বর্তমানে চারটি স্থানীয় চ্যানেল পার্টনারের মাধ্যমে ৩০০-এর বেশি বাংলাদেশি সরবরাহকারী আলিবাবার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
আলিবাবা ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র চ্যানেল অপারেশন স্পেশালিস্ট ওয়াং কুইলিং ভ্যানিয়ার মতে, বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সোর্সিং হাব। কোম্পানিটি ‘প্ল্যাটফর্ম-প্লাস-লোকাল-পার্টনার’ মডেলে পরিচালিত হয়। আলিবাবা বৈশ্বিক ক্রেতা নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে, আর স্থানীয় অংশীদাররা রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, অনবোর্ডিং ও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করে। স্থানীয় অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে ট্রেডশি, মেইদাও, স্কাইটেক এবং ম্যাক্সিমো।
এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা নিজেদের অনলাইন স্টোর তৈরি করতে পারেন, বিভিন্ন ভাষায় পণ্য প্রদর্শন করতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুসন্ধানের জবাব দিতে পারেন। পাশাপাশি আলিবাবার ‘রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন’ (আরএফকিউ) ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্ডারের জন্য দরপত্রেও অংশ নিতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল রপ্তানি, পণ্যের উপস্থাপন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনলাইন বিক্রয় কৌশল সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
যদিও বাংলাদেশে আলিবাবার কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে দেশটিতে ভোক্তাভিত্তিক অনলাইন শপিং, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা লজিস্টিক হাব চালুর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে কোম্পানি। তবে ব্যবসায়ী সংগঠন, নীতিনির্ধারক ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ঢাকায় একটি ছোট প্রতিনিধি অফিস স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কোম্পানির মতে, তাদের বিনিয়োগ মূলত প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকেন্দ্রিক, অবকাঠামোনির্ভর নয়।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বি-টু-বি সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আলিবাবা ডটকম বর্তমানে অ্যামাজন বিজনেস ও ইন্ডিয়ামার্টের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশকে তারা একটি সম্ভাবনাময় সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে দেখে। তবে ডিজিটাল রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটি এখনো ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
আলিবাবা ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশবিষয়ক ডোমেস্টিক চ্যানেল ম্যানেজার সোনোবার মাইরা বলেন, বাংলাদেশে বি-টু-বি ই-রপ্তানির প্রবেশ হার ১৫ শতাংশের নিচে, যেখানে ভিয়েতনাম ও ভারতে তা ৩০ শতাংশেরও বেশি। তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা এবং জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পেমেন্ট নিশ্চিতকরণে বিলম্ব এবং পুরোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ছোট অর্ডার পরিচালনায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হন।
এই সমস্যা সমাধানে আলিবাবা স্থানীয় পেমেন্ট সমাধানের একটি পাইলট প্রকল্প চালু করেছে এবং ব্যাংক ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে বিকাশও রয়েছে। কোম্পানির লক্ষ্য সীমান্তপারের লেনদেনকে সহজ করা এবং বিশেষ করে এক হাজার ডলারের নিচের রপ্তানি অর্ডারের ক্ষেত্রে পেমেন্ট প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা।
দীর্ঘমেয়াদে আগামী তিন বছরে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি রপ্তানিকারককে ডিজিটালভাবে বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় করতে চায় আলিবাবা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে Bangladesh China Chamber of Commerce and Industry, Bangladesh Garment Buying House Association এবং Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association। এসব সহযোগিতার আওতায় রপ্তানিকারক প্রশিক্ষণ, অনবোর্ডিং সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মাইরার মতে, বৈশ্বিক ক্রেতারা এখন সোর্সিং গন্তব্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং অনলাইন প্রোকিউরমেন্ট ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছে। ফলে ডিজিটাল সোর্সিং প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। তিনি মনে করেন, এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রা অনুমোদন, স্পষ্ট ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা এবং আরও কার্যকর রপ্তানি পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য