![]()
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১৩ দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। দলের সাবেক নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের একটি অংশ পৃথক অবস্থান নেওয়ায় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকাশ্যে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ২৮ বছরের ইতিহাসে দলটি সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
সংকটের পটভূমি তৈরি হতে শুরু করে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর। দলের অভ্যন্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ও প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। ১৯ মে কালীঘাটে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহাসহ কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে দলীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। বিশেষ করে ফলতার জাহাঙ্গির খানকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা পরোক্ষভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই লক্ষ্যবস্তু করেন। ওই বৈঠকে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন, যদিও পরে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।
২২ মে দিল্লির বঙ্গভবনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি আকস্মিক সাক্ষাৎ নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দেয়। সাক্ষাতের পর ঋতব্রত রাজ্যে সহযোগিতামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পক্ষে মন্তব্য করেন এবং জানান, প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন। এই মন্তব্যকে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
এরপর ২৫ মে থেকে তৃণমূলের অভ্যন্তরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ও অন্যান্য পরিষদীয় পদে মনোনয়নের জন্য পাঠানো নথিতে কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। ২৭ মে ঋতব্রত ও সন্দীপন এ বিষয়ে স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর ভিত্তিতে বিধানসভার সচিবালয় পুলিশে অভিযোগ দায়ের করলে তদন্তে নামে সিআইডি। এই ঘটনার পর থেকেই তৃণমূল পরিষদীয় দলে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং আলাদা ব্লক গঠনের তৎপরতা শুরু হয়।
২৮ মে সিআইডি তদন্ত শুরু করলে দলের ভেতরে অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। এদিকে ৩০ মে সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। তার ওপর ডিম ও ঢিল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। তবে এ ঘটনায় দলীয়ভাবে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, যা অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩১ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক ডাকলেও ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ২০ জন উপস্থিত হন। পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকায় বৈঠক বাতিল করতে হয়। পরদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে জানান যে সই জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত চলছে। এর কিছুক্ষণ পরই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর বিদ্রোহী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের বিরোধিতা শুরু করে এবং নিজেদের উদ্যোগের নাম দেয় ‘অপারেশন ক্রাউন প্রিন্স’।
সংকটের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ৩ জুন। এদিন ঋতব্রত ও সন্দীপনের নেতৃত্বে ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়, যেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সমর্থন জানানো হয়। একই সঙ্গে নতুন উপদলনেতা ও মুখ্যসচেতকের নামও প্রস্তাব করা হয়। পরে এই গোষ্ঠীর সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকেও অংশ নেন। ঘটনাপ্রবাহের ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য