![]()
ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রকে সামনে রেখে চালকবিহীন যুদ্ধ প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। লাখ লাখ স্বল্পমূল্যের ড্রোন তৈরির লক্ষ্যে এবার প্রথাগত প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের পরিবর্তে উদ্ভাবনী স্টার্টআপ, ড্রোন রেসার এবং শখের ড্রোন নির্মাতাদের ওপর আস্থা রাখছে পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে যে, ছোট, দ্রুতগতির এবং তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের চিত্র বদলে দিতে পারে। সেই বাস্তবতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ দ্রুত নিজেদের ড্রোন সক্ষমতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে পেন্টাগন ‘ড্রোন ডোমিন্যান্স’ নামে ১৮ মাসব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। প্রতিযোগিতায় সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ড্রোন উৎপাদনের জন্য ১.১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি বণ্টন করা হবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী অর্থবছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত ৫৪.৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ড্রোনগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলোর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম। একটি ড্রোন তৈরিতে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ডলার ব্যয় হয়। মূলত এগুলোকে ‘অ্যাট্রিটেবল’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য যুদ্ধ সরঞ্জাম হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যবহার করে হারিয়ে ফেললেও বড় ক্ষতি হবে না।
স্পোর্টস ড্রোন রেসিং প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত এসব ড্রোন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলতে পারে এবং মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানার সক্ষমতাও রয়েছে। পেন্টাগনের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ দূরত্বে হামলা, ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং জটিল পরিবেশে নেভিগেশনের মতো বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে ড্রোনগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে।
বর্তমানে এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ Neros এবং ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান Skycutter। নেরোসের প্রতিষ্ঠাতা সোরেন মনরো-অ্যান্ডারসন একসময় আন্তর্জাতিক ড্রোন রেসিংয়ের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। অন্যদিকে স্কাইকাটার ইউক্রেনীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে ড্রোন উন্নয়নে কাজ করছে।
চলতি বছরের শুরুতে Fort Benning-এ অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের প্রতিযোগিতায় ২৬টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সেখানে সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়ে প্রথম বড় অর্ডারটি পায় স্কাইকাটার। প্রতিষ্ঠানটি ২,৫০০টিরও বেশি ড্রোন সরবরাহের প্রাথমিক চুক্তি অর্জন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগনের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘসূত্রতা ও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য পরিচিত বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের বাইরে গিয়ে এখন দ্রুত উদ্ভাবন সক্ষম ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
গ্যারেজ, ছোট ওয়ার্কশপ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রকল্প থেকে জন্ম নেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। পেন্টাগনের ধারণা, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সাশ্রয়ী ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহারই কৌশলগত সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি হয়ে উঠবে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকের যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর থাকবে না; বরং হাজার হাজার ড্রোনের সমন্বিত ‘ঝাঁক আক্রমণ’ বা স্বয়ংক্রিয় ড্রোন নেটওয়ার্কই যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
পাঠকের মন্তব্য