![]()
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ কর পুনঃপ্রবর্তন, কর অব্যাহতি ও রেয়াত সংকোচন, রফতানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর বৃদ্ধি এবং উৎসে কর ব্যবস্থার পরিধি সম্প্রসারণের মতো নানা পদক্ষেপ বিবেচনায় রয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব সম্ভাব্য উদ্যোগের কারণে বড় ও নিয়মিত করদাতা উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি পূরণের জন্য নতুন করদাতা খোঁজার পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আলোচনা চলছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য পূরণে কর অব্যাহতি পুনর্মূল্যায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে এনবিআর। তবে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের দুর্বল চিত্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কম। ফলে টানা দশম বছরের মতো রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া একই করদাতাদের ওপর বারবার অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো করজাল সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতা শনাক্ত করা। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, দেশে ১৭ থেকে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে করদাতা হিসেবে সক্রিয় মানুষের সংখ্যা খুবই কম। যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হলে একসময় তারাও কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরাও। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, দেশে অনেক উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা কর দেন না, অথচ নিয়মিত করদাতাদের ওপরই নতুন শর্ত ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এতে কর-অনুগত মানুষের মধ্যেও সম্পদ গোপনের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনে করজাল সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতা শনাক্তকরণে জোর দেওয়া উচিত, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় যা মানুষকে ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত করে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ কর-জিডিপি অনুপাতের সরকারি হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, দেশের প্রকৃত জিডিপির আকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। জিডিপির হিসাব পুনর্মূল্যায়ন করা হলে কর-জিডিপি অনুপাতের প্রচলিত ধারণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, জিডিপির হিসাব কিছুটা সংশোধন হলেও কর-জিডিপি অনুপাত নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে না। তার মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের হার এখনও খুবই কম এবং উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ী মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা। জানা গেছে, বিদ্যমান সম্পদভিত্তিক সারচার্জের পরিবর্তে নতুন ধরনের সম্পদ কর চালুর বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে এবং উচ্চ সম্পদধারীদের ওপর সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর কর আরোপের সম্ভাব্য আলোচনা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রশ্ন তুলে বলেন, অনেক মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পেলেও তাদের নিয়মিত আয় থাকে না, ফলে তারা এ ধরনের কর কীভাবে পরিশোধ করবেন তা ভাবনার বিষয়।
এদিকে বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান কর অব্যাহতি, এসআরওভিত্তিক সুবিধা, ট্যাক্স হলিডে এবং বিশেষ কর রেয়াত পুনর্বিবেচনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, করহার অপরিবর্তিত থাকলেও করছাড় কমিয়ে দিলে কার্যকর করহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর রেয়াত সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয় যাতে সংশ্লিষ্ট খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই এসব সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে গেছে, যা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
রফতানি খাতের উদ্যোক্তারাও সম্ভাব্য নতুন কর ব্যবস্থাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় বর্তমানে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর ২০ শতাংশে উন্নীত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এতে অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব হবে। তবে রফতানিমুখী শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে নতুন করের চাপ রফতানি সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, করজাল সম্প্রসারণ ছাড়া বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তার চাপ শেষ পর্যন্ত সীমিত সংখ্যক করদাতার ওপরই পড়বে।
এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল, আলু ও পেঁয়াজসহ অন্তত ২৮টি কৃষি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহে উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে। একই সঙ্গে চিনি আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সুরক্ষা, অবিক্রীত মজুদ কমানো এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। তবে ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, আমদানিনির্ভর এই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ের দামে পড়বে।
ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে ব্যবসার পরিবেশ আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয়ে বলেন, আসন্ন বাজেট ব্যবসাবান্ধব ও সহনীয় করার লক্ষ্যেই কাজ করছে সরকার এবং সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য