![]()
ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির সাবমেরিন ইন্টারনেট ক্যাবলকে ঘিরে নতুন অবস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর এক নতুন ধরনের চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেহরান এখন শুধু তেল পরিবহন বা সামুদ্রিক বাণিজ্য নয়, সমুদ্রগর্ভস্থ ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং এর জন্য ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে দেশটি।
গত ১৮ মে থেকে ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে নতুন একটি সংস্থা হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম তদারকি করছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অধীনে গঠিত এই সংস্থার উদ্দেশ্য হলো, তেহরানের নির্ধারিত সামুদ্রিক নিয়মকানুন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু জ্বালানি পরিবহনের জন্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। প্রণালির তলদেশ দিয়ে সাতটি প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রায় ১৭টি আলাদা সাবমেরিন ক্যাবল লাইন পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ‘সি-মি-উই ৫’, ‘ফ্যালকন’ এবং ‘টিজিএন-গালফ’-এর মতো সিস্টেম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ডাটা পরিবহন করে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যাংকিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, করপোরেট যোগাযোগ ও সরকারি ডিজিটাল সেবা এসব ক্যাবলের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।
ইরান বহুদিন ধরেই এই অবকাঠামোকে একটি সম্ভাব্য চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০১৯ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-তে প্রথম হরমুজ প্রণালির ক্যাবলগুলোর দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয়। তখন দাবি করা হয়েছিল, এই রুট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ট্রাফিকের বড় অংশ প্রভাবিত হতে পারে। যদিও সেই হিসাবকে অতিরঞ্জিত মনে করা হয়, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান ডিজিটাল অবকাঠামোকেও ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।
২০২৬ সালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট রূপ নেয়। আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম পারস্য উপসাগরের ক্যাবল ও ক্লাউড অবকাঠামোর মানচিত্র প্রকাশ করে। এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির কাছ থেকে ক্যাবল ব্যবহারের জন্য ফি আদায়ের চিন্তা করছে তেহরান। এর মাধ্যমে শুধু অর্থ আদায় নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে বাস্তবিক অর্থেই এই ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি তুলনামূলক অগভীর হওয়ায় এবং এখানে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঘন হওয়ায় ক্যাবলগুলো নোঙর, মাছ ধরার সরঞ্জাম বা সামুদ্রিক তৎপরতায় সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যাবল কেটে দেওয়া হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক অবকাঠামোর ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা সামরিক প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে।
এছাড়া এই অঞ্চলে বর্তমানে ব্যাপক সামরিক নজরদারি চলছে। ফলে কোনো অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড গোপনে পরিচালনা করা কঠিন। সামান্য প্রমাণও যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় মিত্রদের কঠোর প্রতিক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের আঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ডাটা ট্রাফিক হঠাৎ বিকল্প রুটে সরিয়ে নিতে হলে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এতে ক্লাউড সার্ভিস, অনলাইন ব্যাংকিং, করপোরেট প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি ডিজিটাল সেবায় বড় ধরনের ধীরগতি বা বিঘ্ন দেখা দিতে পারে। যদিও বৈশ্বিক ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম, তবুও আঞ্চলিক পর্যায়ে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান বাস্তবে ক্যাবল কেটে দেওয়ার চেয়ে এই হুমকিকেই কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী। কারণ শুধুমাত্র এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিতই আন্তর্জাতিক বাজার, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এতে বিমা ব্যয় বাড়বে, মেরামতকারী জাহাজগুলো ঝুঁকি নিতে চাইবে না এবং পুরো অঞ্চলের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির সাবমেরিন ক্যাবল এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন এক ভূরাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। তেল ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাও যে ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হতে পারে, ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান সেই বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য