![]()
দীর্ঘ এক দশকের প্রস্তুতি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর অবশেষে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করছে। এই অগ্রগতি দেশের জ্বালানি খাতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেন্দ্রটি চালু হলে এর প্রাথমিক আয়ুষ্কাল হবে ৬০ বছর, যা প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব—অর্থাৎ মোট ৯০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে পারবে এটি।
প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল, যার প্রতিটিতে ১৫টি করে ফুয়েল রড রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫টি সংরক্ষিত থাকবে। এই জ্বালানি চুল্লিতে স্থাপন করতে সময় লাগবে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর শুরু হবে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়া, যেখানে উৎপন্ন তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। একবার জ্বালানি লোড করলে তা দিয়ে প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, ফলে প্রচলিত জ্বালানির মতো ঘন ঘন সরবরাহের প্রয়োজন পড়ে না।
তবে জ্বালানি লোডিং শেষ হলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হচ্ছে না। এর পরপরই শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হবে। সব ধাপ সফলভাবে শেষ হলে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। প্রাথমিকভাবে আগস্ট নাগাদ প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে, তবে পূর্ণ সক্ষমতায় (১,২০০ মেগাওয়াট) যেতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
এই প্রকল্পের দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। একটি বেসলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে এটি ২৪ ঘণ্টা স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, যা শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বিশ্বে ৩০টির বেশি দেশে শত শত পারমাণবিক চুল্লি চালু রয়েছে, যেখানে ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া এ প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে। বিশেষ করে ফ্রান্স তাদের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৭০ শতাংশই পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদন করে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও এখন বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তির জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্ত হলো।
সব মিলিয়ে, রূপপুর প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দিগন্তই খুলছে না, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করছে।
পাঠকের মন্তব্য