![]()
বাংলাদেশে হামের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কারণ দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র এক মাসে (১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল) ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং প্রায় ২ হাজার ৯০০ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হওয়া—পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। একই সময়ে অন্তত ১৬৬ জনের মৃত্যু, যার একটি অংশ ল্যাব-নিশ্চিত—শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকেত।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট শিশুরা। আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের নিচে, আর উল্লেখযোগ্য অংশ ২ বছরেরও কম বয়সী। অনেক শিশুই টিকা পায়নি বা মাত্র এক ডোজ পেয়েছে—যা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ। আবার কিছু শিশু টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে। ঢাকা বিভাগ-এ সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর বা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে সংক্রমণের হার বেশি। এছাড়া রাজশাহী বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ এবং খুলনা বিভাগ-এও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে বড় কারণ হলো টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হাম-রুবেলা টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত এবং দীর্ঘদিন কোনো বড় ক্যাম্পেইন না হওয়ায় টিকার আওতা কমে গেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু এখন ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকিও বাড়ছে। ভারত ও মিয়ানমার-এর সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং ঢাকার মতো আন্তর্জাতিক যাতায়াত কেন্দ্র থাকায় সংক্রমণ সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে WHO আঞ্চলিক ঝুঁকিকেও ‘উচ্চ’ হিসেবে দেখছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় WHO অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকা ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীকেও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যেখানে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দ্রুত ও কার্যকর টিকাদান নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
পাঠকের মন্তব্য