![]()
তবে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি, রোগীর তথ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এবং মাঠপর্যায়ে এখনো হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকা এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এখনো সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পৌঁছেনি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সিস্টেম পরিচালনায় দক্ষ জনবলও নেই; যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তথ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। পাশাপাশি সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।’
এর আগে ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার দেশের পাঁচ জেলায় ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। ই-হেলথ কার্ডধারী রোগীরা ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল সিস্টেম ও ইলেকট্রনিক পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবেন।
প্রকল্পের প্রথম ধাপ বা পাইলট কার্যক্রমে পাঁচটি জেলায় একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালু করা হবে। ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড কানেক্টেড থাকবে ইলেকট্রনিক পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে। আর ইলেকট্রনিক পেশেন্ট সিস্টেম কানেক্টেড থাকে ইলেকট্রনিক রেফারেল সিস্টেমের সঙ্গে। এতে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগীর তথ্য সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীভূত ডেটাবেজে সংরক্ষণ করতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে রোগী দেশের যেকোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলে তার পূর্ববর্তী চিকিৎসা তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে, যা দ্রুত ও নির্ভুল চিকিৎসা প্রদানে সহায়ক হবে।
এছাড়া গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, হেলথ হাব ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে একীভূত করে একটি প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। শহরাঞ্চলেও একই কাঠামো অনুসরণ করে ওয়ার্ডভিত্তিক প্রাইমারি হেলথ ইউনিট গড়ে তোলা হবে। এ পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার আর্কিটেকচার, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। পরবর্তী সময়ে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে সারা দেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালগুলোতেও এখনো ই-হেলথ কার্ড বাস্তবায়নের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ডিজিটাল ডিভাইস, নিরাপদ সার্ভার বা নেটওয়ার্ক সাপোর্ট—কোনোটিই পর্যাপ্ত নয়। অনেক জায়গায় এখনো রোগীর তথ্য কাগজভিত্তিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হওয়ায় হঠাৎ করে ডিজিটাল প্লাটফর্মে রূপান্তর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ঘাটতি স্পষ্ট। তথ্য ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা বা সফটওয়্যার পরিচালনায় দক্ষ জনবল অধিকাংশ হাসপাতালেই নেই। সব মিলিয়ে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ই-হেলথ কার্ড বাস্তবায়নে দক্ষ জনবল নিয়োগ অপরিহার্য বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবলের অনেক কম রয়েছে। সেখানে ই-কার্ড বাস্তবায়নে যদি জনবল বাড়ানো না হয়, তাহলে এটা আরেকটা বোঝা তৈরি হবে। আমরা দেখেছি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে অনলাইন ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারটা এখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রাথমিক যে কাজগুলো অনলাইনে করা হয়, সেগুলোও কিন্তু আমরা এখনো করতে পারি না। মানে ডিজিটালি কাজ করার মতো দক্ষতা এখনো তৈরি হয়নি। সমন্বয়ের অভাব, লোকবল-সরঞ্জামের ঘাটতি এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। তবে কার্ডটি যদি পূর্ণাঙ্গ অনলাইনভিত্তিক হয়, তাহলে পুরোপুরি কার্যকর হবে এবং এর সুফলও মিলবে।’
এছাড়া মাঠপর্যায়ের ই-হেলথ কার্ডের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো দেখা যাচ্ছে না। যে পাঁচটি জেলা দিয়ে এ কার্ড চালুর কথা রয়েছে, সেসব জেলায় এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা পৌঁছেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বগুড়া জেলার সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হেলথ কার্ড যদি চালু করা হয় তাহলে এটি অবশ্যই দারুণ একটি উদ্যোগ। কারণ এতে একজন রোগীর সব ধরনের ডেটা সংরক্ষিত থাকবে। তবে এটি কার্যকর করার জন্য হাসপাতালগুলোতে দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট দরকার। সরকার যেহেতু পরিকল্পনা করেছে, তা বাস্তবায়নের দিকেও তারা গুরুত্ব দেবে। কোনো ধরনের নির্দেশনা পেলেই আমরা সে অনুযায়ী কাজ শুরু করব।’
নোয়াখালী জেলার সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশনা পৌঁছেনি। অনেক হাসপাতালেই পর্যাপ্ত কম্পিউটার, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রশিক্ষিত জনবল নেই। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের পদ্ধতি কার্যকর করতে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল প্রয়োজন।’
এখন পর্যন্ত ই-হেলথ কার্ডের কোনো নির্দেশনা আসেনি বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন নুরুল আমিন। একই তথ্য জানিয়েছেন খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন।
মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতির ঘাটতির পাশাপাশি বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে আসছে তথ্যনিরাপত্তার বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-হেলথ কার্ড একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য যেমন রোগের ইতিহাস, চিকিৎসা নথি, পরীক্ষার ফলাফলের তথ্য সংরক্ষিত থাকতে পারে। ফলে এ তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং নীতিগত ও আইনি—তিন দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের মতে, এটি বাস্তবায়নে শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে তা বড় ধরনের ডেটা লিক বা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্য তথ্য ফাঁসের একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের সংবেদনশীল তথ্য হ্যাকারদের হাতে চলে গেছে। ফলে এ বিষয়ে সতর্কতা আরো জরুরি হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হেলথ কার্ড রয়েছে। এটা খুব সংবেদনশীল বিষয়। অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করতে হবে এবং নজরদারিতে রাখতে হবে। এটিতে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ইনপুট করা থাকবে, কোনো চিকিৎসক রোগীর অনুমতির পরিপ্রেক্ষিতে কেবল এটি ব্যবহার করতে পারবেন। বিভিন্ন সময় আমরা দেখি জনগণের তথ্য চুরি হয়। এমনকি সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও হেলথ কার্ডের তথ্য চুরির ঘটনা আছে। এজন্য যারা হেলথ কার্ড প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করবেন তাদের এ দিকগুলো নজরে রাখা উচিত। বাংলাদেশে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
ই-হেলথ কার্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি এখনো একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদনের পর পরই আশা রাখি এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হয়ে যাবে। প্রকল্পটি কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য তখন যা যা প্রয়োজন যেমন সুপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে এবং জুনের মধ্যে পাইলট এলাকার কিছু মানুষের হাতে ই-হেলথ কার্ড পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’