![]()
বাংলাদেশের আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত বর্তমানে এক গভীর মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা মিলিয়ে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বুকিং বাতিলের প্রবণতা বাড়তে থাকে, যার প্রভাব এখন পুরো খাতজুড়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ সুদের হার এবং ডলার-নির্ভর বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা একত্রে ডেভেলপারদের নগদ প্রবাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে অনেক প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ডেভেলপাররা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রিয়েল এস্টেট খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে প্রায় ২৬ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কয়েক বছর আগেও তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল।
বুকিং বাতিলের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ডেভেলপাররা বলছেন, উচ্চ আয়ের অনেক ক্রেতা দেশ ত্যাগ করেছেন বা বড় বিনিয়োগ থেকে বিরত আছেন। একই সঙ্গে অনেকেই ‘অপেক্ষা করো-দেখো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। এতে অগ্রিম বুকিং নির্ভর অর্থায়ন মডেল কার্যত ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে ইস্পাত, সিমেন্ট ও জ্বালানির মতো নির্মাণ উপকরণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রড ও সিমেন্টের মূল্যবৃদ্ধি নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন। এতে নতুন প্রকল্প শুরু করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা শহরের আবাসন বাজারে ইতোমধ্যে বিক্রি ৩০–৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, আর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের চাহিদা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেক ডেভেলপারের ক্ষেত্রে মাসে কয়েক ইউনিট বিক্রি থেকে নেমে এসেছে এক বা দুই ইউনিটে। ছোট ও মাঝারি ডেভেলপাররা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন, কারণ তাদের মূলধন ও নগদ প্রবাহ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও স্থিতিশীল নয়, যদিও কিছু ডেভেলপার তুলনামূলকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে বাজারে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে এবং নতুন প্রকল্প শুরু করার হারও কমে গেছে, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই খাত শুধু নিজেই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহনসহ ২০০টির বেশি শিল্পও প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে আবাসন খাতের মন্দা এখন একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি এখন মূল আহ্বান হলো— সুদের চাপ কমানো, দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের আবাসন ঋণ চালু করা এবং আটকে থাকা প্রকল্পগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে নীতি সহায়তা দেওয়া। না হলে এই মন্দা আরও দীর্ঘায়িত হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য