![]()
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী USS Gerald R. Ford। বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি বহনকারী এই বিশাল যুদ্ধজাহাজটি হঠাৎ করেই পরিণত হয়েছে মানবিক সংকটের এক অস্বস্তিকর প্রতীকীতে।
একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জাহাজটির শত শত নৌসেনা সদস্য এখন তাদের নির্ধারিত শয্যা হারিয়ে জাহাজের মেঝে কিংবা ডাইনিং টেবিলের ওপর রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধের চাপ, দীর্ঘ সমুদ্র মিশন এবং যান্ত্রিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অগ্নিকাণ্ডের এই নতুন দুর্ভোগ—সব মিলিয়ে মানবিক দিক থেকে কঠিন সময় পার করছেন জাহাজটির নাবিকরা।
সংবাদমাধ্যম TRT World এবং The New York Times–এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই বাস্তবতা। সেখানে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর ৬০০ জনেরও বেশি নৌসেনা সদস্য তাদের নির্ধারিত শয্যা হারিয়েছেন।
আগুনের সূত্রপাত এবং দীর্ঘ লড়াই
গত সপ্তাহে যুদ্ধজাহাজটির লন্ড্রি কক্ষে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে ছোট একটি ঘটনা মনে হলেও দ্রুতই তা বড় আকার ধারণ করে।
জাহাজের ক্রুদের জন্য এটি ছিল কঠিন এক লড়াই। আগুন নেভাতে প্রায় ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে বলে জানিয়েছেন সামরিক কর্মকর্তারা।
এই দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে অনেক নৌসেনা ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করেছেন। ফলে বেশ কয়েকজন শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং অন্তত দুজনকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাহাজটির প্রধান লন্ড্রি ব্যবস্থা। ফলে এখন নৌসেনারা শুধু শয্যা হারাননি, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও বন্ধ হয়ে গেছে। কাপড় ধোয়ার মতো সাধারণ কাজও এখন তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
মেঝেতে রাত, তবু দায়িত্ব থেকে সরে না নাবিকরা
যারা নিজেদের কেবিন হারিয়েছেন, তাদের এখন অস্থায়ীভাবে জাহাজের মেঝে কিংবা টেবিলে ঘুমাতে হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে ভরা একটি যুদ্ধজাহাজে এই দৃশ্য অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
তবে নাবিকদের জন্য এটি বাস্তবতা।
সারাদিন বিমান পরিচালনা, অস্ত্র প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন সামরিক দায়িত্ব পালন করার পর তারা বিশ্রামের জন্য ফিরে আসেন এমন এক জায়গায়, যেখানে আর তাদের জন্য কোনো শয্যা নেই।
কেউ মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে পড়ছেন, কেউ আবার ডাইনিং টেবিলের ওপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তবু পরদিন ভোরেই আবার তাদের ফিরতে হচ্ছে দায়িত্বের ময়দানে।
দীর্ঘ সমুদ্র মিশনের ক্লান্তি
এই রণতরীতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ নৌসেনা ও ফাইটার পাইলট রয়েছেন।
গত বছরের ২৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী Pete Hegseth জাহাজটিকে নতুন মিশনে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রথমে এটি ভূমধ্যসাগর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়।
এই পদক্ষেপ ছিল ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট Nicolás Maduro–এর ওপর চাপ বাড়ানোর বৃহত্তর সামরিক কৌশলের অংশ।
পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়তে থাকলে জাহাজটিকে সেখানে মোতায়েন করা হয়।
এখন পর্যন্ত জাহাজটির ক্রুরা প্রায় ১০ মাস ধরে টানা সমুদ্রে মোতায়েন রয়েছেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই মিশন চললে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের রেকর্ড ভেঙে যাবে।
যদি মিশন মে মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়, তবে ২০২০ সালে USS Abraham Lincoln–এর ২৯৪ দিনের সমুদ্র মিশনের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যান্ত্রিক সমস্যাও বাড়ছে
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকায় যুদ্ধজাহাজটিতে নানা ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
ক্রুদের অভিযোগ, জাহাজে থাকা প্রায় ৬৫০টি টয়লেটের পানির লাইন প্রায়ই বিকল হয়ে যাচ্ছে। এতে দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর United States Central Command জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে জাহাজের ইঞ্জিন বা চলাচল ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ সচল রয়েছে।
তবু বাস্তবতা হলো—দীর্ঘ মিশন, যান্ত্রিক সমস্যা এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণে নাবিকদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
যুদ্ধের মধ্যেও মানবিক বাস্তবতা
সাবেক নৌ কর্মকর্তা এবং পেন্টাগনের সাবেক মুখপাত্র John F. Kirby বলেছেন, দীর্ঘদিন সমুদ্রে টানা মোতায়েন থাকলে শুধু মানুষই নয়, জাহাজও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তার ভাষায়,
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলে যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে এবং ক্রুদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা আশা করা কঠিন হয়ে যায়।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—যুদ্ধ শুধু অস্ত্র, কৌশল বা রাজনীতির বিষয় নয়। এর ভেতরে থাকে হাজার হাজার মানুষের জীবন, তাদের ক্লান্তি, ভয় এবং প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও জাহাজটি থেকে ২৪ ঘণ্টা বিমান পরিচালনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী। যুদ্ধের মিশন থেমে নেই।
কিন্তু সেই মিশনের আড়ালে, সমুদ্রের মাঝখানে ভাসমান এই বিশাল যুদ্ধজাহাজে প্রতিরাতে শত শত নাবিকের ঘুম ভাঙছে মেঝের ঠান্ডা ধাতব স্পর্শে—যা যুদ্ধের মানবিক মূল্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
পাঠকের মন্তব্য