![]()
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা অবশেষে পূর্ণ হলো। ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রোববার রাতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অধ্যাদেশ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করেছে।
উল্লেখযোগ্য যে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের ১০ দিনের মধ্যে বিচার বিভাগের এই পৃথক সচিবালয় স্থাপনের অধ্যাদেশ প্রকাশিত হলো। এতে ৭ ধারার বিধান ব্যতীত বাকি সব ধারা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সমস্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম এখন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের আওতায় হবে। তবে অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা বিচারকরা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবেন। উদাহরণস্বরূপ—নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জুডিশিয়াল এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও আইন কমিশনে কর্মরত বিচারকরা আইন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে থাকবেন।
পৃথক সচিবালয়ের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি বহু বছর ধরে বিভিন্ন মহল থেকে উত্থাপিত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশন সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবি জানায়। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই মামলায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়।
প্রায় ২৬ বছর পর, ২০২৫ সালে উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে এই দীর্ঘমেয়াদী দাবি পূর্ণতা পেল। অধ্যাদেশের জারি হওয়া মানে, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হচ্ছে।
ধারা ৭-এর বিবরণ
ধারা ৭ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সার্ভিস প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করবে। এতে অন্তর্ভুক্ত:
-
সুপ্রিম কোর্টের সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন।
-
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা।
-
নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কার্যাদি সচিবালয় ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে সুপ্রীম কোর্টের সংশ্লিষ্ট কমিটির পরামর্শে সম্পন্ন হবে।
-
কমিটির সদস্য নির্ধারণ আপীল বিভাগের বিচারকগণ কর্তৃক করা হবে।
-
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পদায়ন ও বদলি কার্যাদি রাষ্ট্রপতির বিধিমালা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শে সম্পাদিত হবে।
সচিবালয় কার্যকর হলে কী পরিবর্তন হবে
-
সুপ্রিম কোর্টের অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি ইত্যাদি পরিচালনা করবে সচিবালয়।
-
উচ্চ আদালতের বিচারকরা প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন সচিবালয় কর্তৃক সমন্বয় করা হবে।
-
অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিচারকরা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবেন।
উপদেষ্টা পরিষদের মন্তব্য
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন—
“আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতের সচিবালয় সম্পূর্ণ কার্যকর হবে। এটি বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
মানবিক দিক ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের কর্মীরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, বিচার প্রক্রিয়া আরও নিরপেক্ষ হবে, এবং নিম্ন আদালতের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুশৃঙ্খলতা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা বিচারিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের প্রতি সুবিচারের বিশ্বাস বৃদ্ধি করবে।