![]()
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা, কটূক্তি ও দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেফতার করার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে দেশের লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান ও মৌলিক স্বাধীনতার বর্তমান বাস্তবতা। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় একটি পালাগানের আসরে তাঁর পরিবেশনার একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় কিছু মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে আটক করে। অভিযোগ ওঠে—তিনি ইসলাম ধর্মকে ‘অপমান’ করেছেন এবং ‘দাঙ্গার আশঙ্কা তৈরি’ করেছেন।
ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মো. আব্দুল্লাহ দণ্ডবিধির ১৫৩, ২৯৫এ এবং ২৯৮ ধারায় মামলা করেন। অভিযোগে বলা হয়, আবুল সরকার তাঁর গানের অংশে ‘অশালীন কটূক্তি’ করেছেন এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। মামলার সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়, ‘তৌহিদী জনতা’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপ মানববন্ধন করে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি জানায়।
“পুরো ভিডিও নয়, কেটে নেওয়া অংশ ভাইরাল করা হয়েছে”— শিষ্যদের দাবি
আবুল সরকারের শিক্ষার্থী ও অনুসারীরা দাবি করছেন—
ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, পালাগানের সম্পূর্ণ পরিবেশনা না দেখিয়ে নির্দিষ্ট কিছু লাইন কেটে ভাইরাল করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। রাজু সরকার নামে তাঁর এক শিষ্য বলেন—
“এটি ছিল গল্পনির্ভর পালা—উপস্থিত দর্শকদের বোঝানোর জন্য শিল্পী চরিত্র নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কিছু মহল বিষয়টিকে উল্টোভাবে উপস্থাপন করে শিল্পীকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।”
শিষ্যরা আরও জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে কিছু ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে পালাগান ও বিচারগানের আসর বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছিল। এই ঘটনাটি সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
পালাগান— বাংলার সাধনার শতবর্ষী ঐতিহ্য
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পালাগান কেবল সঙ্গীত নয়—এটি বাংলার গ্রামীণ সমাজে জীবনদর্শন, প্রশ্নোত্তর, নৈতিকতা আর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য। বহুকাল ধরে এই গান ধর্মীয় আচার–অনুসন্ধানকে নাটকীয়ভাবে তুলে ধরে এসেছে।
দার্শনিক ও লেখক ফরহাদ মজহার বলেন—
“পালাগানের ভাষা, উপস্থাপনা, গল্প—সবই নাটকীয়। সেখানে প্রশ্ন থাকবেই, বিতর্ক থাকবেই। এটিকে ধর্ম অবমাননা হিসেবে দেখা সাংস্কৃতিক অজ্ঞতা।”
তিনি আরও বলেন—
গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ আশা করেছিল সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বাড়বে; কিন্তু শিল্প–সংগীত নিয়ে ভীতি, হামলা ও দমন–পীড়ন বরং বেড়েছে।
আইনের ইতিহাস— কেন বিতর্ক বাড়ছে
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজ্ঞ শাহদীন মালিক জানান—
দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারা উপনিবেশকালীন একটি আইন, যা ১৯২৫ সালে সম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে যুক্ত হয়। তাঁর মতে—
“ধর্ম অবমাননা—এটি মধ্যযুগীয় ধারণা। অভিব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে এমন আইনের অস্তিত্ব সাংঘর্ষিক।”
তিনি আরও বলেন, ধারাগুলোর সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর। আদালত চাইলে অভিযুক্তকে সতর্ক করে মুক্তিও দিতে পারেন।
মানবিক প্রশ্ন— শিল্পী কি ন্যায্য বিচার পাচ্ছেন?
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন—
একজন শিল্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ঘিরে যে ‘জনরোষ’ তৈরি হয়েছে, সেটি বিচারপ্রক্রিয়াকে চাপের মধ্যে ফেলছে। তাঁরা মনে করেন,
-
সম্পূর্ণ ভিডিও পরীক্ষা না করা,
-
শিল্পীর বক্তব্য না শোনা,
-
একপক্ষের চাপের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া—
এসবই ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা।
সংস্কৃতিকর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন—
বাংলাদেশ কি আবার সেই সময়ে ফিরে যাচ্ছে, যখন সঙ্গীত, পালাগান, আধ্যাত্মিকতা—সবকিছু ভয় ও শাস্তির ছায়ায় ঢাকা পড়ে ছিল?
“শিল্পী আঘাত করেন না, প্রশ্ন তোলেন”— মানুষের সহমর্মিতা বাড়ছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহু মানুষ মানবিক সুরে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তাঁদের ভাষায়—
“শিল্পী প্রশ্ন তোলেন, আঘাত করেন না। ভিন্নমত দমন করে মানবিক মূল্যবোধকে বাঁচানো যায় না।”
স্থানীয় অনেকেই বলছেন, আবুল সরকার বহু বছর ধরে অসহায়, দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে পালাগান করে এসেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
মানবিক সমাধানের আহ্বান
বিশিষ্টজন, সংগীতশিল্পী, আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের সার্বিক মত—
এই ঘটনা বাংলাদেশের বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য বড় পরীক্ষা। তাঁরা বলেন—
-
আবেগ নয়,
-
প্রতিহিংসা নয়,
-
বরং বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত,
-
সম্পূর্ণ ভিডিও পর্যালোচনা,
-
এবং শিল্পীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার হওয়া জরুরি।
তাদের আহ্বান—
“যেখানে সংস্কৃতি ভয়ে বাঁচে, সেখানে মানবিকতা শুকিয়ে যায়। এই দেশে শিল্পীর নিরাপত্তা রাখতে হবে, সংলাপের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।”
পাঠকের মন্তব্য