দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবাধ লুটপাট, ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়মের সংস্কৃতি এখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ‘বড় বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই অনিয়মের জাল কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত যেন দেশের আর্থিক খাতে নতুন আরেকটি বোঝা তৈরি না করে। তারা মনে করছেন, শুধু কাঠামোগত সংস্কার নয়, বরং ‘নৈতিক সংস্কার ও আইনি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা’ এখন সময়ের দাবি।
‘ব্যাংকিং সংকট নয়, এটি নৈতিক সংকট’ — বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের আব্দুল্লাহ ফারুক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে।
‘বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের রূপান্তর: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনাটি যৌথভাবে আয়োজন করে ঢাবির ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টার (পিটিইআরসি)।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ। তিনি বলেন,
“দেশের ব্যাংক খাতে যা হয়েছে, তা কোনো ব্যাংকিং সংকট নয়, এটি নৈতিক সংকট। এ সংকটের ভুক্তভোগী হচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থা নিজেই। এর প্রভাবে জাতীয় সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“যতটুকু ক্ষত সারানো সম্ভব হয়েছে, সেটাই সৌভাগ্যের বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমার পথে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারও স্থিতিশীল। রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালে আমরা মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যাব।”
আগামী ফেব্রুয়ারিতে আসছে নতুন কাঠামো
ডেপুটি গভর্নর জানান, ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমগুলো আগামী ফেব্রুয়ারি নাগাদ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় চলে আসবে।
তিনি বলেন,
“নতুন ফ্রেমওয়ার্কে ব্যাংকের বোর্ড সদস্যদেরও কেপিআই (মূল কার্যসম্পাদন সূচক) নির্ধারিত থাকবে। প্রান্তিক পর্যায়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্ব পাবে। দেশের তরুণ মানবসম্পদকে পুঁজি হিসেবে কাজে লাগাতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।”
‘আরেকটি বিডিবিএল নয়’ — সতর্ক করলেন ঢাবির অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক মো. মাকসুদুর রহমান সরকার বলেন,
“২০০৯ সালে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে একীভূত করে বিডিবিএল গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু আজও সেটি লাভজনক হয়নি। নতুন একীভূতকরণ যেন আরেকটি বিডিবিএল তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি যোগ করেন,
“বিচারহীনতার সংস্কৃতি ব্যাংক খাতে দুর্বৃত্তায়নের জন্ম দিয়েছে। এখন সময় এসেছে কেবল সংস্কার নয়, কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। আর সেই পদক্ষেপ শুরু করতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্য থেকেই।”
‘আইনি ব্যবস্থা ছাড়া শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়’ — আহসান উল্লাহ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ বলেন,
“আমরা অতীত ভুলে যেতে চাই না, তবে শোধরাতে চাই। এজন্য আইনি ব্যবস্থা জরুরি। ১০-১২ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার পরও অনেক ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাই একীভূতকরণই এখন বাস্তবসম্মত পথ।”
তিনি আরও বলেন,
“এই প্রক্রিয়া সফল হলে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক তৈরি হবে। আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার দিকে এগোচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞদের মত: নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা ও দক্ষতা জরুরি
অনুষ্ঠানে পিটিইআরসির চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ–উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা, ডিন মাহমুদ ওসমান ইমাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তামজিদ আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক হুমায়ুন কবির, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান, এবং বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির প্রমুখ।
সবাই একমত হন,
“ব্যাংক খাতের টেকসই রূপান্তর ঘটাতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, এবং নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।”
পাঠকের মন্তব্য