একটি আগুন—যা পুড়িয়ে দিয়েছে শুধু কার্গো ভিলেজ নয়, বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির হৃদপিণ্ডকেও। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এখন তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ খাত ও টেলিকম সরবরাহ শৃঙ্খলে নেমে এসেছে গভীর সংকট।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, এই অগ্নিকাণ্ডের অভিঘাত শুধু পুড়ে যাওয়া পণ্যের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আসন্ন বড়দিনের রপ্তানি মৌসুমের আগে এটি পুরো শিল্পখাতে ধস নামাতে পারে।
আগুনে পুড়ে গেছে শিল্পের ভবিষ্যৎ
গত সপ্তাহে বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে লাগা আগুনে পোশাক, ওষুধ, টেলিকম যন্ত্রাংশসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ চালান পুড়ে যায়।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা—ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রপ্তানিকারকদের ভাষায়, এ আগুন ‘একটি পুরো সরবরাহ চেইনকে ভেঙে দিয়েছে।’
অনেক কারখানায় আগুনে পুড়ে গেছে নমুনা, লেইস, আনুষঙ্গিক সামগ্রী ও উৎপাদনের উপকরণ, যেগুলো ছাড়া উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়বে।
“এখন যদি দ্রুত বিকল্প উপকরণ না পাওয়া যায়, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করবে। এর প্রভাব পড়বে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকায়।”
— ফয়সাল সামাদ, পরিচালক, বিজিএমইএ
বড়দিনের অর্ডারে অনিশ্চয়তা
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়টা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। এই সময় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ব্র্যান্ডের জন্য অর্ডার পাঠানো হয় বড়দিন ও নিউ ইয়ার বিক্রির জন্য।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকৃত নমুনা ও উপকরণগুলো সময়মতো না পৌঁছালে অর্ডার সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
ফলে অর্ডার বাতিল ও ভবিষ্যতের চুক্তি স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন,
“আমরা সরকার থেকে আশ্বাস পেয়েছি। ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ চলছে। তবে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
ওষুধ ও টেলিকম শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত
অগ্নিকাণ্ডের আগুনে পুড়ে গেছে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল এবং টেলিকম খাতের যন্ত্রাংশও।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের এমডি মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন,
“এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশের ওষুধ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। অনেক চালান ছিল সময়নির্ভর ও তাপমাত্রা-সংবেদনশীল। একটি চালান নষ্ট হলেও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
টেলিকম খাতে ক্ষতির পরিমাণও বিপুল। মাতাতা ট্রেডিং কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মোবাইল যন্ত্রাংশ আগুনে পুড়ে গেছে।
এসব যন্ত্রাংশের মধ্যে ছিল স্যামসাং, ওপ্পো, ভিভো, রিয়েলমি, ওয়ানপ্লাসসহ একাধিক ব্র্যান্ডের পণ্য।
রপ্তানি-আমদানি প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা
প্রতিদিন বিমানবন্দরে প্রায় ১,০০০ টন শুকনো পণ্য হ্যান্ডেল করা হয়।
আগুনের কারণে এখন এই সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে মারাত্মক চাপ।
বিএএফএফএর সাবেক সহসভাপতি নুরুল আমিন বলেন,
“আগেই চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটের কারণে অনেক পণ্য বিমানবন্দরে সরানো হয়েছিল। এখন এই আগুনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।”
সরকার সাময়িক সমাধান হিসেবে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে গুদামের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে।
সেইসঙ্গে কার্গো ভিলেজকে সপ্তাহজুড়ে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছে যাতে দ্রুত পুনরুদ্ধার কাজ সম্পন্ন হয়।
আগুন নেভাতে বিলম্বের অভিযোগ
ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করেছে,
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন) ও ফায়ার সার্ভিস সময়মতো সাড়া না দেওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হয়েছে।
তবে সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা এস কে বশির উদ্দিন দাবি করেন,
“আগুনের খবর পাওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই দমকল বাহিনী কাজ শুরু করে। ৩৭টি ইউনিট অংশ নেয় এবং ওয়াসা অতিরিক্ত পানি সরবরাহ দেয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।”
মানবিক দিক: ঝুঁকিতে শ্রমিক ও ব্যবসায়ী
এই দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু কারখানার মালিকদের নয়—প্রভাব পড়েছে লাখো শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জীবনে।
যে অর্ডারগুলো বাতিল হবে, তার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিকের অতিরিক্ত সময় ও বোনাসও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
একজন রপ্তানি প্রস্তুতকারক বলেন,
“আমাদের ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগেনি, কিন্তু সেই আগুনের ছাই এখন আমাদের জীবিকায় পড়ছে।”
সামগ্রিক প্রভাব
-
পোশাক রপ্তানিতে অন্তত ২৫–৩০ শতাংশ বিলম্বের আশঙ্কা
-
ওষুধ ও টেলিকম খাতে উৎপাদন স্থবিরতা
-
বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়া
-
বীমা খাতে ক্ষতিপূরণের চাপ
-
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুবিধা বৃদ্ধি
বিশেষজ্ঞ মত
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন,
“এই আগুন বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, বিশেষ করে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।”
পুনর্গঠনের প্রত্যাশা
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের একটাই চাওয়া—সরকার দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিক।
এই আগুনের ধোঁয়া শুধু কার্গো ভিলেজে নয়, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি শাখায়।
পাঠকের মন্তব্য