উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর মাঠ–পার্কগুলো এখনো দখলমুক্ত হয়নি। নানা প্রভাবশালী মহল, ক্লাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থগোষ্ঠী এ ধরনের সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে ব্যবহার করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
শনিবার (১৬ আগস্ট) সকালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে ‘মাঠ, পার্ক, জলাধার দখলমুক্ত আন্দোলন’ ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন পরিবেশবাদী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ও নীতি–বিশ্লেষকরা। বক্তারা বলেন, “মাঠ ও পার্ক মানুষের জন্য, ব্যক্তিগত ক্লাব বা ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য নয়।”
মাঠ–পার্ক দখলের চিত্র
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সম্পাদক ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ। আলোচনায় উঠে আসে রাজধানীর নানা মাঠ ও পার্ক দখলের করুণ চিত্র।
-
ধানমন্ডি মাঠ: একসময় সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু একটি ক্লাব অবৈধভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। মাঠকে শুধুমাত্র নিজেদের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। এমনকি জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা মাঠ থেকে শেয়ার বিক্রি করে কোটি টাকা আয় করেছে তারা।
-
গুলশানের শহীদ তাজউদ্দিন স্মৃতি পার্ক: ৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ পার্ক গুলশান ইয়ুথ ক্লাব দখল করে ফুটবল টার্ফ বানিয়েছে। ঘণ্টাভিত্তিক ভাড়া নিয়ে আয় করছে। অথচ আদালতের একাধিক রায় আছে এ পার্ক দখলমুক্ত করার। কিন্তু রাজউক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) উল্টো ক্লাবকে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আদালতের রায় ও বাস্তবতা
গত বছরের অক্টোবরে রাজউক ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ডিএনসিসি আবারও সেই চুক্তি পুনর্বহাল করেছে। বক্তারা বলেন, এটি আদালতের নির্দেশনার সরাসরি অবমাননা এবং জনগণের অধিকার হরণের শামিল।
নাগরিক সমাজের দাবি
পরিবেশবাদী ব্যক্তিত্ব হাফিজুর রহমান ময়নার সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন—
-
রাজধানীতে খোলা মাঠ ও পার্ক দিন দিন কমছে।
-
শিশু–কিশোররা খেলাধুলার জায়গা পাচ্ছে না, বৃদ্ধরা হাঁটার পথ হারাচ্ছেন।
-
মাঠ ও পার্ক দখল মানে কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি মানুষের জীবনমান ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তাঁদের দাবি, দখলদারদের তালিকা প্রকাশ করে গণমাধ্যমে তুলে ধরা হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিলের পরিকল্পনাও জানানো হয়।
মানবিক দৃষ্টিকোণ
রাজধানীর শিশুদের হাসি, কিশোরদের খেলার মাঠ, প্রবীণদের হাঁটার পথ, সাধারণ মানুষের সবুজ ছায়ার আশ্রয়—সবই আজ হুমকির মুখে। মাঠ ও পার্ক দখল হয়ে গেলে তা শুধু প্রজন্ম নয়, একটি জাতির মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাকেই ধ্বংস করে। নাগরিক সমাজ তাই বলছে, “মাঠ মানে শুধু খেলার জায়গা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।”
পাঠকের মন্তব্য