![]()
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশে পাঁচ বছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমেছে ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অতিরিক্ত মাছ ধরা, সামুদ্রিক মাছের মজুত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের সীমিত সক্ষমতা এবং দুর্বল নজরদারিকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পরিবেশগত পরিবর্তন ও দূষণ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণে এ পতন হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক শাখার উপপ্রধান মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে সামুদ্রিক মাছের মজুতের ওপর চাপ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জেলেরা সাধারণত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান না। তবে এ ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রথাগত পদ্ধতিতে মাছ আহরণ বেশি কমেছে
সামুদ্রিক মাছ আহরণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রথাগত নৌযানের আহরণ কমলেও শিল্পভিত্তিক ট্রলারের আহরণ সামান্য বেড়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্ষুদ্র ও প্রথাগত পদ্ধতিতে মাছ ধরা নৌযানগুলো ৫ লাখ ১৩ হাজার ৮১৯ টন মাছ আহরণ করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৬৬১ টনে।
অন্যদিকে, একই সময়ে শিল্পভিত্তিক ট্রলারের মাধ্যমে মাছ আহরণ ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টন থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫১ টনে দাঁড়িয়েছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক পার্থ প্রতিম বর্মণ বলেন, মাছ আহরণের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সামুদ্রিক মাছের মজুতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, শিল্পভিত্তিক ট্রলারগুলো অনেক সময় নির্ধারিত গভীর সমুদ্র এলাকার পরিবর্তে তুলনামূলক অগভীর পানিতে মাছ ধরে। একই এলাকায় ছোট নৌযান ও বড় ট্রলার মাছ আহরণ করলে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং নির্দিষ্ট প্রজাতির ওপর চাপ তীব্র হয়।
তাই শুধু মাছ আহরণের পরিমাণ নয়, কোথায় এবং কী পদ্ধতিতে মাছ ধরা হচ্ছে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
মাছের মজুতের নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি
সামুদ্রিক মাছের মজুত সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায় কোন প্রজাতির কত মাছ রয়েছে এবং কতটা আহরণ করলে মজুতের ক্ষতি হবে না, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন মৎস্য আহরণ ক্ষেত্রের সম্ভাবনা যাচাই করতেও এ ঘাটতি বাধা সৃষ্টি করছে।
পার্থ প্রতিম বর্মণ বলেন, কয়েক দশক ধরে সমুদ্রে মাছ আহরণ করা হলেও বাংলাদেশে এখনো প্রজাতিভিত্তিক মাছের মজুতের নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। এ জন্য গবেষণা ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এতে কোন প্রজাতির মাছ কত পরিমাণে রয়েছে এবং টেকসইভাবে কতটা আহরণ করা সম্ভব, তা নির্ধারণ করা যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কে এম আজম চৌধুরী বলেন, দেশে মাছ আহরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। অনেক দেশে মাছ অবতরণকেন্দ্রে আহরণের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশেও সমন্বিত তথ্য সংগ্রহব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে কোথায় কত মাছ ধরা হচ্ছে, কতটা অবতরণ করা হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাচুর্যে কী পরিবর্তন আসছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
পার্থ প্রতিম বর্মণ বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্যও নির্ভরযোগ্য তথ্য জরুরি। প্রজাতিভিত্তিক মজুত নিরূপণ করা না গেলে টুনার মতো গভীর সমুদ্রের মাছের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা কঠিন হয়। এতে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে।
মোখলেছুর রহমান জানান, অতিরিক্ত মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং নির্দেশিকা অনুযায়ী নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় টুনাসহ সমুদ্রের উপরিভাগ ও মধ্যবর্তী স্তরে বিচরণকারী মাছ ধরার জন্য বিদেশি প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে জেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশগত পরিবর্তন ও দূষণের প্রভাব
পানির তাপমাত্রার পরিবর্তন, দূষণ, সমুদ্রের পানির অম্লতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক মাছের আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। পার্থ প্রতিম বর্মণ বলেন, এসব পরিবর্তনের কারণে কিছু প্রজাতির মাছ তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে পারে। তবে মাছ আহরণ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব কারণের পৃথক প্রভাব নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কে এম আজম চৌধুরী বলেন, নদী ও সমুদ্রে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ দূষণ। পাশাপাশি অবৈধ মাছ আহরণ এবং সমুদ্রে পরিত্যক্ত বা হারিয়ে যাওয়া জাল সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করছে। এসব জালে মাছ ও অন্যান্য প্রাণী আটকে মারা যেতে পারে। এ ঘটনাকে ‘ঘোস্ট ফিশিং’ বলা হয়।
মোট মাছ উৎপাদনে সমুদ্রের অবদান কমছে
সামুদ্রিক মাছ আহরণ কমার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মোট মাছ উৎপাদনে সমুদ্রের অবদানও হ্রাস পেয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ২১ দশমিক ৮৮ শতাংশ আসত সমুদ্র থেকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা কমে ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার আরও কমে ১১ দশমিক ১২ শতাংশে নেমেছে।
কে এম আজম চৌধুরী বলেন, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মাছের সরবরাহ, বাজারদর এবং মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়তে পারে। মাছের প্রাপ্যতা কমলে দাম বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তাদের প্রাণিজ আমিষ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হতে পারে।
পার্থ প্রতিম বর্মণ সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত মাছ আহরণ চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রজাতিভিত্তিক গবেষণা বাড়ানো, বাণিজ্যিক মাছ আহরণে বিধিনিষেধ কার্যকর করা, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করা এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষায় নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।