![]()
ইবি রিপোর্ট
মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানো সহজ ও সাশ্রয়ী করতে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) মাধ্যমে মালদ্বীপের মুদ্রা রুফিয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা, ভ্রমণ ব্যয়ে রুফিয়া ব্যবহারের সুযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপের সম্ভাবনা যাচাই।
এ বিষয়ে মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির (এমএমএ) গভর্নর আহমেদ মুনাব্বারকে গত ৮ অক্টোবর চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের একটি যৌথ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বৈঠকেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দুই দেশের আইন ও বিধিবিধান মেনে নিরাপদ, স্বচ্ছ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
রুফিয়া থেকে সরাসরি টাকায় রেমিট্যান্সের প্রস্তাব
মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা দেশটির স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া বিনিময়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশটির ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি রুফিয়া গ্রহণে আগ্রহী না হওয়ায় অনেক প্রবাসীকে খোলাবাজার থেকে রুফিয়া দিয়ে মার্কিন ডলার কিনতে হয়। এরপর ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে হয়। এতে মুদ্রা রূপান্তর ও রেমিট্যান্স পাঠানোর দুই ধাপেই অতিরিক্ত খরচ হয়।
এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম প্রস্তাব, এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের আওতায় উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করে মালদ্বীপের মুদ্রা মালদ্বীভিয়ান রুফিয়া (এমভিআর) ব্যবহার করে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ চালু করা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিরা স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পাঠাতে পারবেন। পরে বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে তা প্রাপকের কাছে বাংলাদেশি টাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
গত মাসে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেন, মালদ্বীপে কর্মরত এক লাখের বেশি বাংলাদেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। তিনি সরাসরি রুফিয়া থেকে টাকায় রেমিট্যান্স পাঠানো, বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা বা এক্সচেঞ্জ হাউস স্থাপন, স্বীকৃত মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তি এবং মুদ্রা রূপান্তর ফি ও প্রণোদনায় স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাব দেন।
ভ্রমণ ব্যয়ে রুফিয়া ব্যবহারের সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রস্তাবে মালদ্বীপে ভ্রমণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগ্য ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে দেশটির মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বৈধ রেমিট্যান্স চ্যানেলের মাধ্যমে মালদ্বীপে সংগৃহীত রুফিয়ার তহবিল ব্যবহার করে দেশটির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফার অপারেটরগুলোর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো ভ্রমণকারীদের জন্য টাকায় মূল্য নির্ধারিত কার্ড ইস্যু করতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থ নিষ্পত্তির পদ্ধতি পারস্পরিক সমঝোতা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বৈধ আর্থিক লেনদেন বাড়ানোর পাশাপাশি মালদ্বীপ থেকে আসা স্থানীয় মুদ্রার তহবিল ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে।
কারেন্সি সোয়াপের সম্ভাবনাও যাচাই
তৃতীয় প্রস্তাবে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। এ ধরনের ব্যবস্থায় দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত শর্তে নিজেদের মুদ্রা বিনিময় করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, উপযুক্ত কাঠামো তৈরি করা গেলে মালদ্বীপ থেকে রেমিট্যান্স দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত কাঠামো বা বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। প্রস্তাবটি নিয়ে মালদ্বীপের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মালদ্বীপে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকা কাম্য নয়। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাঁদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে পারেন, সেটিই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মালদ্বীপ থেকে দেশে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ৯৯ লাখ ২০ হাজার, আগস্টে ৭৬ লাখ এবং সেপ্টেম্বরে ২ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপের অবস্থান ছিল ১৮তম।
তবে পুরো গত অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ কমেছিল প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছিল ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের অর্থ পাঠানোর ব্যয় ও জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং কার্যকর নিষ্পত্তি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।