![]()
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার নিজেদের বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়ার কাছ থেকেই ডিজেল নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে মস্কোর বাড়তি ডিজেল সরবরাহের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে।
সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আগের কর্মদিবসের তুলনায় ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ১৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৩১ ডলারে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম নির্দেশক আইসিই গ্যাস-অয়েলের দামও ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১ হাজার ৪৩৬ ডলারে নেমেছে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। আগামী নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল দেওয়া হবে। এরপর অতিরিক্ত ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের কথাও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানির মূল্য বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচেও। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে বাড়তি ডিজেল সরবরাহের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির জোগান বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
জ্বালানি বাজারে দাম কমার পেছনে রাশিয়ার সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হামলা বন্ধের আলোচনাও ভূমিকা রেখেছে। গতকাল রোববার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে।
সমঝোতা কার্যকর হলে তেল শোধনাগার ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রের ওপর হামলার আশঙ্কা কমতে পারে। এতে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। তবে সম্ভাব্য এই সমঝোতা কত দিন কার্যকর থাকবে এবং বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, এসব ঘোষণার ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমেছে। তবে যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হবে এবং কত দিন স্থায়ী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ কারণে এসব ঘোষণার প্রভাবে তেলের দামে বড় ধরনের পতন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।
রাশিয়ার বাড়তি ডিজেল সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে হামলা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার বাড়তি ডিজেল সরবরাহের ইতিবাচক প্রভাব সীমিত হয়ে আসতে পারে।
কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলারের চাহিদাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে সোমবার এশিয়ার মুদ্রাবাজারে ডলার সূচক সামান্য কমে ১০২ দশমিক ১৪ পয়েন্টে নেমেছে। এর আগে গত সপ্তাহে সূচকটি ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সোমবারও সূচকটির অবস্থান সেই উচ্চপর্যায়ের কাছাকাছি ছিল। বিশ্বের প্রধান ছয়টি মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের শক্তি পরিমাপ করা হয় এই সূচকের মাধ্যমে।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেপ্টেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামী বুধবার দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক প্রকাশ করা হবে। চলতি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সুদের হার নির্ধারণে মূল্যস্ফীতির এই পরিসংখ্যান প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের অর্থনীতি নিয়ে আস্থা আরও কমেছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতির নতুন পরিসংখ্যানের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজারের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। এক মাস আগেও এই সম্ভাবনা ছিল ৫১ শতাংশ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল রোববার রয়টার্সকে বলেন, সদস্যদেশগুলোর উচিত ডিজেলের অতিরিক্ত মজুত বাজারে ছাড়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা। যেসব দেশ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জ্বালানি পুরোপুরি সরবরাহ করেনি, তাদের অবশিষ্ট সরবরাহ দ্রুত বাজারে ছাড়ার আহ্বানও জানান তিনি। বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিরল।
পাঠকের মন্তব্য