![]()
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতির অবনতি এবং সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। তবে সৌদি আরব ইরানের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গতকাল রোববার টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় আরাগচি বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করে সামরিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটগুলোর সমাধান সামরিক উপায়ে সম্ভব নয়। এর আগে গত সপ্তাহেও তিনি বলেছিলেন, মার্কিন যুদ্ধের ‘কোনো সামরিক সমাধান নেই’। আরাগচির ভাষায়, ‘কেবল ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে আলোচনাই’ সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় আরাগচি জানান, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু করা এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত তেহরান। তবে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপটি কে শুরু করেছিলেন, সৌদি আরব ইরানের সহায়তা চেয়েছিল কি না কিংবা তেহরান নিজে থেকেই প্রস্তাবটি দিয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। প্রস্তাবটি নিয়ে রিয়াদের অবস্থানও এখনো পরিষ্কার নয়।
রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক দফা প্রাণঘাতী হামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্বিবেচনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য তাঁর আগের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করবে না। নতুন মন্তব্যে মার্কিন নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের দ্বিধা ও আঞ্চলিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় পুনরায় চালু হওয়া দূতাবাসগুলোও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ওই চুক্তির আগে দুই দেশের মধ্যে সাত বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধকে আরও উসকে দিয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান ও রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর ইরান এবং তাদের মিত্ররা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদ ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার মধ্যে সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রও রয়েছে।
গত মার্চে সৌদি যুবরাজ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা সহ্য করার সীমা রয়েছে। তিনি তেহরানকে তাদের কৌশল ‘পুনর্বিবেচনা’ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলায় বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইয়েমেনসহ বিভিন্ন স্থানের নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানেও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দিচ্ছে তেহরান। ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, এ ধরনের উদ্যোগের অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর নির্ভরতা কমানো।
সৌদি আরব ইরানের প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে পারে। কারণ, রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হুতিদের ওপর তেহরানের প্রভাব রয়েছে এবং তাদের হামলা বন্ধ করতে ইরান ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান হতে পারে, ইরানের মধ্যস্থতার পরিবর্তে হুতিদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করাই বেশি কার্যকর।
ইরান অবশ্য হুতিদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত নির্ধারণের ক্ষমতা থাকার দাবি অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, হুতিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। ফলে সৌদি আরবের পক্ষে ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব গ্রহণ করা এবং ইরানের পক্ষে হুতিদের হামলা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখা—দুটিই বাস্তবে জটিল হতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রস্তাবটির বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো নিশ্চিত অগ্রগতি জানা যায়নি। সৌদি আরব কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইরান তার প্রস্তাবকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে পারে কি না, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
পাঠকের মন্তব্য