
ইবি রিপোর্ট
জ্বালানি ও সারের দাম বাড়া এবং পে-স্কেলের প্রভাবসহ মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নীতি সুদহার কমায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ানো এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এ সময় ডেপুটি গভর্নর সারোয়ার হোসেন ও আনিছুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এসএলএফ ও এসডিএফ হারও অপরিবর্তিত
মুদ্রানীতি কমিটির সিদ্ধান্ত তুলে ধরে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, নীতি সুদহারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সংকটের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুবিধা ‘স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ)’ হার ১১ শতাংশে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)’ হারও ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনও রয়েছে। তাই আপাতত সুদহারে পরিবর্তন না করে সতর্ক অবস্থান ধরে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তিনি জানান, গত জুনে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রবৃদ্ধি নিয়ে পূর্বাভাস
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ৪ দশমিক ৬ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ তাদের পূর্বাভাস সংশোধন করে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাকে বাধাগ্রস্ত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি।
এ জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক কৌশল অনুসরণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতে সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিনিময় হার ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল নমনীয়তা বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্য হিসেবে মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ ৩২.৭৮ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য তুলে ধরে ডেপুটি গভর্নর বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের দুর্বল পরিস্থিতি ফুটে উঠছে বলে জানান তিনি।
তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রবাসী আয় ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানান ড. হাবিবুর রহমান।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষি, সিএমএসএমই এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য আরও ৪০ কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই প্যাকেজের অর্থ যাতে যথাযথভাবে বিতরণ করা যায়, সে জন্য শিগগিরই একটি বিস্তারিত কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ড. হাবিবুর রহমান।