
ইবি রিপোর্ট
মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরছে। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু আগস্ট মাসেই এক মাসের ব্যবধানে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমেছে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি ৮ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানির পরিমাণও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬৬৮ কোটি ২ লাখ টাকা।
পরের মাস আগস্ট শেষে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমেছে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি ৮ লাখ টাকা।
ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পর যে অর্থ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে না, সেটিই সাধারণভাবে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকা হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের শুরুতে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছিল।
জানুয়ারি মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। মার্চে আরও বেড়ে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা।
তবে এপ্রিল মাসে এসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমে যায় ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি ১ লাখ টাকা। এরপর মে মাসে আবার মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ওই মাসে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।
এরপর জুন মাস থেকে আবারও কমতে শুরু করে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ। জুনে কমে ১২ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং জুলাইয়ে কমে ৭ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।
সর্বশেষ আগস্টেও এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে জুন, জুলাই ও আগস্ট—টানা তিন মাসেই ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরতে শুরু করেছিল। এই প্রবণতা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
এরপর মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ আবার বেড়ে যায়। এপ্রিল মাসে তা আবার কমে। মে থেকে জুন পর্যন্ত আবার বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। জুলাই থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে আবারও মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ কমতে থাকে।
ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়াকে অতীতে নগদ টাকা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগের কারণে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাসায় নগদ অর্থ রাখছিলেন।
এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা করলেও মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ একপর্যায়ে বাড়তেই থাকে।
২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকা বা রিজার্ভ মানির পরিমাণও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে ব্যাংক খাতে রিজার্ভ মানির স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬১ কোটি ৪ লাখ টাকা।
পরের মাস আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৬০ হাজার ২৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে রিজার্ভ মানি কমেছে ৩ হাজার ৩৭৬ কোটি ৮ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ এবং ব্যাংক খাতে রিজার্ভ মানি—দুই ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। টানা তিন মাস ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের অর্থ ফেরার প্রবণতাও স্পষ্ট হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য