
ইবি রিপোর্ট
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ জোগান নিয়ে চাপে পড়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আহরণ শুধু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমই নয়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের ৫৪ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকার চেয়েও কম। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আহরণে ঋণাত্মক প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সরকার মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম দুই মাসের রাজস্ব আহরণের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি এনবিআর।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজস্ব আহরণ সরাসরি সম্পর্কিত। মানুষের আয় বাড়লে আয়কর, ব্যবসার মুনাফা বাড়লে করপোরেট কর এবং আমদানি বাড়লে কাস্টমসসহ অন্যান্য রাজস্ব বাড়ে। তাই অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য যত গতিশীল হবে, রাজস্ব আহরণের সুযোগও তত বাড়বে। ভবিষ্যতে সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যকে কতটা সহায়তা করে এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করে, তার ওপর রাজস্ব আহরণের বড় অংশ নির্ভর করবে।
বাজেটের অর্থায়ন পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলছে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগের স্থবিরতা। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক মুনাফায়। অর্থনীতির গতি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সরকারের কর আহরণের ভিত্তিও সংকুচিত হচ্ছে।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। টানা পাঁচ মাস ধরে তা ৫ শতাংশের নিচে। এ প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আহরণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় মেটাতে ঋণনির্ভরতাও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ক্রমাগত কমছে, অন্যদিকে সরকারি খাতের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতের বিনিয়োগই কমছে, যার প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আহরণে।
তিনি বলেন, উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকটে গ্রামগঞ্জের অনেক ক্ষুদ্র, কুটির ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃহৎ শিল্পও চাপের মধ্যে রয়েছে। ব্যবসা বন্ধ হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব আয়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে নতুন বিনিয়োগও কমছে।
সরকারি খাতেও বিনিয়োগের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। পরিচালন খাতে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হওয়ায় উন্নয়ন খাতে ব্যয় পিছিয়ে পড়ছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, যা পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরেও এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে। জুলাই-আগস্ট দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে।
ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে মূলধনি ব্যয়ের বাস্তবায়ন পিছিয়ে থাকছে। এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ছে।
সরকারের ব্যয়চাপের অন্যতম বড় উৎস এখন জ্বালানি খাত। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বেড়েছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একই সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। চলতি অর্থবছরের শুরুর আড়াই মাসে এলএনজি খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানির ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। বিদ্যুৎ খাতেও লোকসানের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য ও সেবার মূল্যও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তার ব্যয়ক্ষমতা কমে গিয়ে অর্থনীতির ধীরগতি দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিও সরকারের ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করছে। কয়েক ধাপে বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর আর্থিক চাপ চলতি অর্থবছর থেকেই শুরু হচ্ছে।
বর্ধিত বেতন-ভাতার পুরোটা কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন বাবদও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে।
শিল্প খাতের স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতেও। একই সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। সেবা খাতের আমদানি ব্যয়ও একই ধারায় বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশ থেকে ৪৪২ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই মাসে তা কমে হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে পণ্য আমদানি হয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৫৯৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
রপ্তানি আয় কমা এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার এ প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থবছর শেষে বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজেটের ওপর অতীতের নেওয়া ঋণ পরিশোধের দায়ও বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার।
জুলাই ও আগস্টে বিদেশি ঋণ ছাড় হয়েছে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার। বিপরীতে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থবছরের বাকি সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরও বাড়বে। এর সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও রয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। আগস্ট ও চলতি মাসে সরকারের ঋণের চাহিদা আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআর আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে কত দ্রুত এবং কী পরিমাণ রাজস্ব পাওয়া যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলে নিয়মিত রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী করাও কঠিন হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থবছরের শুরুতেই সরকার অর্থসংকটে পড়েছে—বিভিন্ন আলামত থেকে তা বোঝা যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যয়ের চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও সামগ্রিক চাপ কমছে না। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। এর সঙ্গে বড় প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের দায়ও যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্তও ব্যয়ের চাপ বাড়াচ্ছে। বড় ব্যয়ের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শুধু কর বাড়িয়ে বা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে এ চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ, রাজস্ব আয় এবং ব্যয় সাশ্রয়—সব দিক সমন্বয় করেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীও বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরও ভর্তুকির চাপ রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মূলধনি ব্যয় হচ্ছে না। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি বেশি মাত্রায় দেশীয় ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে এবং সুদহার বাড়তে পারে। রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে না এনে ব্যয় অনুমোদনের ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মুদ্রার মান ও আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি ব্যয়, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে বাজেট অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সামনে রাজস্ব আহরণ কতটা বাড়ানো যায় এবং ব্যয়ের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হয়, তার ওপর সরকারের অর্থায়ন পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করবে।
পাঠকের মন্তব্য