
ইবি রিপোর্ট
দীর্ঘদিন আটকে থাকা আমানত ফেরত নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার পরও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে টাকা তোলার জন্য গ্রাহকদের বড় ধরনের চাপ দেখা যায়নি। ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানত ফেরতের আবেদন করা গ্রাহকদের প্রায় ৭১ শতাংশ এখনো তাদের টাকা উত্তোলন করেননি। একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে ৮৯৪ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭৭ জন গ্রাহক আমানত ফেরতের আবেদন করেন। এসব আবেদনের বিপরীতে ফেরত চাওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে ৩৫ হাজার ৯০৭ জন গ্রাহক ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। ফলে আবেদন করা গ্রাহকদের বড় অংশের অর্থ এখনো ব্যাংকেই রয়েছে।
ব্যাংক সূত্র বলছে, আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুরুর দিকে টাকা উত্তোলনের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ কমেছে। ১ সেপ্টেম্বর ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। তাদের মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ১২৫ জন গ্রাহক ৩১৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেন।
২ সেপ্টেম্বর আরও ১৯ হাজার ৬১৩ জন গ্রাহক ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। তাদের মধ্যে ৮ সেপ্টেম্বর ৭ হাজার ২৩৪ জন ৩৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। পরবর্তী দুই দিনে গ্রাহকদের উত্তোলনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩৮১ কোটি ও ৩৯১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ব্যাংক থেকে আমানত বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন অর্থও জমা হচ্ছে। ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর চার দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে ৮৯৪ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ১৪১ কোটি, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫ কোটি, ৯ সেপ্টেম্বর ২৪৪ কোটি এবং ১০ সেপ্টেম্বর ৩১৪ কোটি টাকা জমা পড়ে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, আমানত ফেরতের আবেদন করেও গ্রাহকদের বড় একটি অংশ টাকা তুলছেন না। শাখা থেকে ফোন করা হলে অনেকে পরে টাকা না তোলার সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছেন। তার মতে, এতে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফেরার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের অর্থপ্রবাহ ও লেনদেন এখন প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে। নগদ লেনদেনের পাশাপাশি আরটিজিএস, বিএফটিএন ও ক্লিয়ারিং কার্যক্রমও চালু রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আপাতত আমানত উত্তোলনের চাপ কম থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ কমেছে।
এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমানত ফেরতের জন্য ব্যাংকটিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। শুরুতে আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট’ আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। এরপর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়।
তবে আমানত উত্তোলনের চাপ কম থাকাকেই এখনই গ্রাহকদের স্থায়ী আস্থা ফিরে আসার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, নতুন ব্যাংকটির সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১৬ হাজার কর্মী, ৭৫৯টি শাখা ও প্রায় ৭০০ উপশাখার পুনর্বিন্যাস করতে হবে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমিয়ে কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও সামনে রয়েছে।
খেলাপি ঋণও ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। গত জুন শেষে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়ম বন্ধ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়েও ব্যাংকটিকে কাজ করতে হবে।