
ইবি আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ায় বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ অবকাঠামোয় হামলার পর বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহঝুঁকি কতটা রয়েছে, তা পর্যালোচনা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
লোহিত সাগর অভিমুখী সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল সৌদি আরব। এখন আবার ওই বন্দর থেকে জাহাজে তেল তোলা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যায়ন চলছে।
বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৩ সেন্ট বা ০ দশমিক ৮৬ শতাংশ কমে ১০৭ ডলার ৮২ সেন্টে নেমে আসে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৯৭ সেন্ট বা ০ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ৮৬ সেন্ট হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দামই ৩ ডলারের বেশি বেড়েছিল। ওই দিন উভয় ধরনের তেলের দাম ১৯ মে’র পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ইয়ানবু বন্দরে তেল ওঠানো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইউরোপে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় দাম বেড়েছিল।
এদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল, গ্যাসোলিন ও পরিশোধিত জ্বালানির মজুত—সবই বেড়েছে। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) তথ্যের বরাত দিয়ে তারা এসব তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছে ৭ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, ওই সময়ে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল কমতে পারে।
চীনের ব্রোকারেজ কোম্পানি হাইটং ফিউচার্স এক নোটে জানিয়েছে, এপিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী গ্যাসোলিন ও ডিজেলের মজুতও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়েছে। এতে তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে আঞ্চলিক পর্যায়ে মজুত বাড়লেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এখনো কম—এই বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
গত শুক্রবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার পর সৌদি আরব ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। এরপর ইয়ানবু বন্দরে তেল ওঠানোও বন্ধ হয়ে যায় বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সৌদি আরবের এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের বন্দরে পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে। পরিমাণটি বিশ্বের দৈনিক মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই আবার তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা।
তবে রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনটি কত দিন বন্ধ থাকতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। একজনের মতে, পাইপলাইন মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অন্য একজন জানিয়েছেন, মেরামতের কাজ চলার মধ্যেই পাইপলাইনের একটি অংশ দিয়ে দ্রুত তেল সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে লিবিয়ায় পৃথক একটি ঘটনায় তিনটি তেলক্ষেত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এই ঘটনার সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। দেশটির ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন (এনওসি) জানিয়েছে, বিক্ষোভরত পেট্রোলিয়াম ফ্যাসিলিটিজ গার্ডের সদস্যরা হামাদা-জাওইয়া অপরিশোধিত তেল রপ্তানি পাইপলাইনের ভাল্ভ বন্ধ করে দেওয়ায় তেলক্ষেত্রগুলোর কার্যক্রমে এই বিঘ্ন ঘটেছে।
তবে ওই ঘটনায় লিবিয়ার মোট তেল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। এনওসির চেয়ারম্যান মাসউদ সুলেমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখনো প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হচ্ছে।
ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশার বিপরীতে তেলের মজুত বাড়ায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ পুনরুদ্ধারের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে নজরদারি বাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মজুত, উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
পাঠকের মন্তব্য