
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিদেশে পলাতক চার আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং মানব পাচার মামলার আসামি মোল্লা নজরুল ইসলাম রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে তার লিখিত জবাব টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিদেশে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে থাকা বাংলাদেশি মিশনগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, চলতি বছর বিদেশ থেকে হত্যা মামলার দুই আসামি মো. আরিফ সরকার ও মোবারক মন্ডলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি জানান, হত্যা মামলায় অভিযুক্ত এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত মো. আরিফ সরকারকে গত ৬ মে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে একই ধরনের মামলায় অভিযুক্ত ও ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত মোবারক মন্ডলকে গত ২৭ মে কাতার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্যান্য আসামিদের ক্ষেত্রেও একইভাবে আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়ার পর ১৬ জুন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হয়।
তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় দেশটি পারস্পরিক সহযোগিতার নীতির আওতায় প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা চেয়েছে। তাদের অনুরোধের পর গত ৪ আগস্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
লিবিয়ায় গ্রেপ্তার মোল্লা নজরুলকে ফেরানোর উদ্যোগ
মানব পাচার মামলার আসামি মোল্লা নজরুল ইসলামও বিদেশে পলাতক রয়েছেন। তিনি ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আসামি বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মোল্লা নজরুল ইসলাম লিবিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে গত ১৬ মার্চ কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তার দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরাতে ভারতের কাছে প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
একই সঙ্গে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও সংসদে জানান তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত এসব আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
ইন্টারপোল ও বিদেশি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শুধু আলোচিত চার আসামিই নয়, বিদেশে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক আসামিদেরও শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ কাজে ইন্টারপোলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যেসব আসামির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে, তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে পালিয়ে থাকা আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার একদিকে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিচ্ছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছে। যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, সেসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপ
কোনো পলাতক আসামিকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সাধারণত শনাক্তকরণ, গ্রেপ্তার, আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং প্রত্যর্পণ বা বহিষ্কার-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ সরকার এসব প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগ এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে নথিপত্র পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালসহ বিদেশে অবস্থানরত আলোচিত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কূটনৈতিক, আইনগত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ অনুসরণ করছে। ইতোমধ্যে দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর আরও কয়েকজনকে ফেরাতে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
পাঠকের মন্তব্য