
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোট শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সিইসির নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল। পরে বিকেলে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনার কথা জানান সিইসি।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে চায় কমিশন। আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতার কারণে তফসিল ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, বছরের শেষ দিকে নির্বাচন আয়োজন করতে হলে আগামী মাসেই তফসিল ঘোষণা করতে হবে। সাধারণত ভোটের প্রস্তুতির জন্য প্রায় দুই মাস সময় রেখে তফসিল ঘোষণা করা প্রয়োজন হয়। তাই সেপ্টেম্বরকে তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় হিসেবে সামনে রেখে কমিশন কাজ করছে।
নভেম্বরে ইউপি ভোটের লক্ষ্য
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সিইসি জানান, ২০২১ সালে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনের প্রথম ধাপে জুন মাসে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হয়েছিল। এবারও এসব ইউনিয়নকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সব এলাকায় একই সময়ে ভোট আয়োজন করা সম্ভব হবে না। কোনো ইউনিয়নে সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতা, মামলা বা অন্য কোনো আইনগত সমস্যা থাকলে সেগুলো বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতিও ভোটের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সিইসি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ভোট কোনোভাবেই খারাপ মৌসুমে আয়োজন করা যাবে না। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভোট আয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের ইউনিয়নগুলোতেও আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শুষ্ক মৌসুমে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নভেম্বরে কেন নির্বাচন চায় কমিশন
সিইসি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সময় খুব সীমিত। ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ওই সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হবে। এরপর ঈদুল আজহা, বর্ষাকালসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে আসবে। ফলে নভেম্বর থেকে শীতকাল পর্যন্ত সময়কে ভোট আয়োজনের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী মনে করছে কমিশন।
এ ছাড়া দুর্গাপূজা, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পাবলিক পরীক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। কারণ নির্বাচনের সময় স্কুল-কলেজের ভবন ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং শিক্ষকদের একটি বড় অংশকে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষার সময়সূচি প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের অনুরোধ জানাবে নির্বাচন কমিশন। পরীক্ষা দ্রুত শেষ করা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন
দেশে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নির্বাচন একসঙ্গে না করে ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ইউপি নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি অনুযায়ী অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন করা হবে। পৌরসভা নির্বাচনও প্রথম ধাপের সঙ্গে করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্র, নির্বাচনি সামগ্রী, বাজেট এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কেনা কিছু নির্বাচনি সামগ্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় নতুন করে সব সামগ্রী কেনার প্রয়োজন হবে না।
ভোটার তালিকা ও আইন সংশোধনের প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণবিধি-সংক্রান্ত আইন এবং বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আইন সংশোধনের খসড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদে পাসের প্রয়োজন হবে। এসব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার দিকেও নজর রাখছে নির্বাচন কমিশন।
নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভোটের প্রতিশ্রুতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়েও কথা বলেন সিইসি। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
সিইসির ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডে আয়োজন করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তার চেয়ে ভালো করার চেষ্টা থাকবে। ভোটারদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাকে কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। তবে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা সরাসরি কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও মৌসুম বিবেচনায় ভোট
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।
একই সঙ্গে বর্ষাকাল ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। দুর্গম ও পার্বত্য অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোতেও যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সিইসি জানান, সব দিক বিবেচনা করেই নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। শীতকালকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন কর্মসূচি, পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব এবং প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণা এবং নভেম্বরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ভোট শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপে মেয়াদ শেষ হওয়া ও নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে জটিলতামুক্ত ইউনিয়নগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ সময় পর আবারও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনি কার্যক্রম জোরালোভাবে শুরু হবে।
পাঠকের মন্তব্য