
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইউক্রেনের নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা দিতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গিয়ে এ বিষয়ে একটি চুক্তি ঘোষণার কথা রয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের।
ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিয়েভ সফরে গেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। সফরে ইউক্রেনকে ব্রিটিশ ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নিজস্ব সংস্করণ তৈরির নকশা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রায় ১৫০ মাইল বা ২৪১ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম স্টর্ম শ্যাডো শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ইউক্রেনের হাতে গেলে দেশটির নিজস্ব দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে দূরপাল্লার অস্ত্র ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে কিয়েভ।
কিয়েভে প্রথম বিদেশ সফরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই অ্যান্ডি বার্নহামের প্রথম বিদেশ সফর। ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে তার কিয়েভ সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সফরে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ৩৫টির বেশি দেশের জোট ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর বৈঠকে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর এই জোটের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন তিনি।
বৈঠকে ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি, সামরিক সহায়তা এবং দেশটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিয়েভ সফরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও বৈঠক করবেন বার্নহাম। প্রায় এক মাস আগে পোর্টসমাউথে দুজনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে ইউক্রেনের উদ্যোগ
রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হয়ে উঠেছে দূরপাল্লার হামলা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো। রুশ সামরিক স্থাপনা ও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম অস্ত্রের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিচ্ছে কিয়েভ।
এই প্রেক্ষাপটে স্টর্ম শ্যাডোর নিজস্ব সংস্করণ তৈরির প্রযুক্তিগত নকশা পাওয়ার বিষয়টি ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ তৈরি স্টর্ম শ্যাডো একটি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি প্রায় ২৪১ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ফলে এ ধরনের অস্ত্রের প্রযুক্তি ও নকশা ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহার করা গেলে ভবিষ্যতে দেশটির দূরপাল্লার অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মিত্রদের কাছ থেকে প্রস্তুত অস্ত্র পাওয়ার পাশাপাশি নিজস্বভাবে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন ইউক্রেনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষেত্রে সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল না থেকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চায় কিয়েভ
দূরপাল্লার আক্রমণাত্মক সক্ষমতার পাশাপাশি রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে চাইছে ইউক্রেন।
কিয়েভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার মধ্যে রয়েছে আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অবকাঠামো রক্ষায় এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে স্টর্ম শ্যাডোর নকশা হস্তান্তরের উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি সামরিক সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক প্রযুক্তি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মস্কোর হুঁশিয়ারির মধ্যেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কিয়েভ সফর
বার্নহামের কিয়েভ সফরের আগে গত সপ্তাহে ইউক্রেনের ব্রিটিশ ড্রোন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিল মস্কো। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছে।
এর মধ্যেই ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কিয়েভ সফর এবং সামরিক প্রযুক্তি সহায়তার সম্ভাব্য ঘোষণা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বিশেষ করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনের পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে, তারও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই সফর থেকে।
ইউক্রেনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ইউক্রেনের জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি দেশটির লক্ষ্য হচ্ছে নিজস্ব ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়ানো।
স্টর্ম শ্যাডোর নকশা পাওয়ার সম্ভাব্য চুক্তি সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হতে পারে। এর মাধ্যমে ইউক্রেন ভবিষ্যতে নিজস্ব প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দূরপাল্লার অস্ত্র তৈরির দিকে আরও এগোতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এ ধরনের সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের ফলে যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়বে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ রাশিয়া বরাবরই পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নত অস্ত্র সরবরাহকে সংঘাত বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কিয়েভ সফর শুধু আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সফর নয়; বরং এটি ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে স্টর্ম শ্যাডোর নকশা হস্তান্তরের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেনের নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে তা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য