
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্সের দ্রুত অগ্রগতির ফলে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন টেক উদ্যোক্তা ও ধনকুবের ইলন মাস্ক। তার পূর্বাভাস, ২০৩৬ সালের মধ্যে কাগজের মুদ্রা বা প্রচলিত অর্থের বর্তমান গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই হারিয়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর সম্পাদক জ্যানি মিন্টন বেডোসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এআই, রোবোটিক্স এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে কথা বলার সময় এমন ধারণা তুলে ধরেন মাস্ক। তার মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এমন একটি সময় আসতে পারে, যখন মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় পণ্য ও সেবার উৎপাদন হবে বিপুল পরিমাণে।
কেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে টাকা?
ইলন মাস্কের যুক্তি, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে অর্থের প্রধান ভূমিকা রয়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহনসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবা পাওয়ার জন্য মানুষ অর্থ ব্যবহার করে। কিন্তু এআই ও উন্নত রোবোটিক্স যদি মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় বহুগুণ বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদনে সক্ষম হয়, তাহলে অর্থের প্রচলিত ব্যবহার ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তার ধারণা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও রোবটের মাধ্যমে উৎপাদন এতটাই সহজ ও সাশ্রয়ী হয়ে উঠতে পারে যে অনেক পণ্য প্রায় বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম মূল্যে পাওয়া সম্ভব হবে। তখন সীমিত সম্পদের জন্য অর্থের বিনিময়ে প্রতিযোগিতার প্রয়োজনও কমে আসতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতির বদলে আসতে পারে ডিফ্লেশন
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু মাস্কের ভবিষ্যৎবাণী এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে।
তার মতে, এআই ও রোবটের মাধ্যমে উৎপাদন যদি অর্থের সরবরাহের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে পণ্য ও সেবার দাম ক্রমাগত কমতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির পরিবর্তে ডিফ্লেশন বা পণ্যের দাম কমে যাওয়াই বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় শ্রমের প্রয়োজন কমে গেলে উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বর্তমানে যেসব পণ্য উৎপাদনে বিপুল অর্থ ও মানবশ্রম প্রয়োজন হয়, সেগুলো ভবিষ্যতে অনেক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এআই
ইলন মাস্ক শুধু অর্থনীতির পরিবর্তনের পূর্বাভাসই দেননি, এআইয়ের সক্ষমতা নিয়েও বড় ধরনের মন্তব্য করেছেন। তার ধারণা, ২০৩১ সালের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এর পরবর্তী কয়েক বছরে শারীরিক শ্রমের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কাজ মানুষের পরিবর্তে হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারখানা, নির্মাণ, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার বাড়তে পারে। ফলে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের কর্মজীবন ও অর্থনৈতিক কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সতর্কবার্তাও
তবে এআই ও রোবোটিক্সের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন মাস্ক। তার আশঙ্কা, যন্ত্র যদি একসময় মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজ ও প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এআইয়ের দ্রুত বিকাশ থামানো সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং মানবস্বার্থ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বদলে যেতে পারে প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণা
ইলন মাস্কের এই পূর্বাভাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অবশ্যই অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক থাকতে পারে। কারণ অর্থের প্রয়োজনীয়তা শুধু পণ্য কেনাবেচার ওপর নির্ভর করে না; সম্পদ, শ্রম, মালিকানা, সেবা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তারপরও এআই ও রোবোটিক্স যে বিশ্ব অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তা নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে কর্মসংস্থান, ভোগব্যবস্থা থেকে সম্পদের মূল্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব পড়তে পারে।
মাস্কের ২০৩৬ সালের পূর্বাভাস তাই শুধু ‘টাকা থাকবে কি থাকবে না’—এই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন, যেখানে এআই, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের জীবনযাপন এবং বিশ্ব অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য