
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
গ্যাসের সংকট এখন কেবল রান্নার সমস্যা নয়, এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর শিল্প কারখানায় উৎপাদন বন্ধের খবরে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত জ্বালানি নীতি এবং খনিজ অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার সম্মিলিত ফলাফল। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিটি সেক্টরে হাহাকার:
গ্যাস সংকটের এই পরিস্থিতি এখন আর ‘ম্যানেজ’ করার মতো পর্যায়ে নেই। উদ্যোক্তারা বলছেন, যখন জ্বালানি থাকে না, তখন উৎপাদন থেমে যায়। আর উৎপাদন থামলে পণ্যের কাঁচামাল ও ব্যাংকের দায়দেনা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে, একসময়ের সফল উদ্যোক্তারা আজ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে। টেক্সটাইল ও ডেনিম ফেব্রিক সরবরাহকারী কারখানাগুলো ২৪ ঘণ্টা অপারেশনে থাকতে অভ্যস্ত। কিন্তু গ্যাসের অভাবে তারা এখন অসহায়। গ্যাসের অভাবে সার কারখানাগুলোও উৎপাদন ঠিক রাখতে পারছে না, যা কৃষিখাতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে পর্যাপ্ত গ্যাসের জোগান না থাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ায় সাধারণ মানুষের জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
উৎপাদন ও আমদানির ভারসাম্যহীনতা
বাংলাদেশে গ্যাসের তীব্র সংকটের নেপথ্যে রয়েছে দেশীয় উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানিনির্ভরতার অদূরদর্শী কৌশল। গত কয়েক বছরে দেশীয় ক্ষেত্র থেকে উত্তোলন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘাটতি পূরণ করা। কিন্তু অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও আমদানির পরিমাণে সামঞ্জস্যের অভাব সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে এলএনজি টার্মিনালের মতো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বিকল হওয়া এবং বিকল্পের অভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে গতিতে দেশীয় উৎপাদন কমছে, সেই হারে নতুন খনির অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১৬-১৭ সালে যেখানে দেশীয় উৎপাদন ১৯ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল, তা এখন ১৫ মিলিয়নে নেমে এসেছে। নেট উৎপাদনের এই ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করে, আমরা খনিজ সম্পদের মজুত ও উত্তোলনে কতটা উদাসীন ছিলাম। আমদানির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করা একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, আজকের সংকট তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা
একসময় গর্ব করে বলা হতো, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। অথচ আজ আমরা আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। নতুন সরকার সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করেছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাস্তববাদী হতে হবে—সাগরে নতুন করে গ্যাস আবিষ্কার এবং তা জাতীয় গ্রিডে নিয়ে আসতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, নতুন অনুসন্ধানের পথে হাঁটলে ফলাফল পেতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ, মধ্যমেয়াদেও আমদানির প্রয়োজনীয়তা ফুরোচ্ছে না। স্থলভাগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে ১৯৯৭ সালের পর থেকে যে দীর্ঘ বিরতি ছিল, তা জ্বালানি নিরাপত্তার পথে বড় ধরনের বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই দীর্ঘ স্থবিরতা কেন হলো, কারা এর দায় নেবে—এই প্রশ্নগুলো আজ জনমনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে আজ আমরা আমদানির বাজারে অসহায় দরে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছি, যার মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ।
টার্মিনাল কেন্দ্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোর সংকট
এলএনজি টার্মিনালকে ঘিরে যে বিতর্ক ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তাকেই নির্দেশ করে। নতুন একটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপনের চুক্তি বাতিল হওয়ার বিষয়টি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এক ধরনের ছন্দপতন ঘটিয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমদানিনির্ভরতাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। জ্বালানি বিভাগ চীনের সহযোগিতায় বিকল্প টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এ ধরনের অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এফএসআরইউ ব্যবসার বাজারের সীমাবদ্ধতা এবং চীনের কোম্পানির অভিজ্ঞতার বিষয়টিও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে, কেবল চুক্তিবদ্ধ হলেই যে দ্রুত সমাধান আসবে, তা ভাবার অবকাশ কম। অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমরা ২-৩ বছর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
রাজনীতিকরণ ও দূরদর্শিতার অভাব
অতীতের সরকারগুলো জ্বালানি খাতকে বিশেষ আইনের অধীনে এনে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়ন, কিন্তু কার্যত সেই প্রকল্পগুলো আমদানিনির্ভরতাকে আরও পাকাপোক্ত করেছে। নিজস্ব খনিজ সম্পদ উত্তোলনের চেয়ে বিদেশ থেকে গ্যাস কেনার আগ্রহ কেন বেশি ছিল—এই সমালোচনার উত্তর আজ জরুরি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিমসহ অনেকেই বারবার বলেছেন যে, সমান্তরালভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করলে জ্বালানি সংকট কাটবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কয়লা এবং দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। রাজনৈতিক বা আদর্শিক পক্ষপাতহীনভাবে যদি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হতো, তবে আজকের এই তীব্র হাহাকার হয়তো দেখতে হতো না।
ভবিষ্যৎ করণীয় কী
এই সংকট থেকে উত্তরণ রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব।
১. বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর ওপর আরও নিবিড় জরিপ চালিয়ে উপরের স্তরে অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। ভোলার গ্যাস কীভাবে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায়, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সিএনজি স্টেশন ও শিল্প কারখানায় যৌক্তিক রেশনিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে যাতে উৎপাদন সচল থাকে।
২. সাগরে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। স্থলভাগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. কেবল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন—সৌর বিদ্যুৎ এবং উইন্ড এনার্জির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের সম্ভাবনাগুলোও নতুন করে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
৪. জ্বালানি অপচয় রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রচার চালাতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্যাসের সাশ্রয়ী ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হবে।
পরিশেষে জ্বালানি খাত আজ বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমদানি করে বা বিদেশ থেকে এলএনজি এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। নিজস্ব খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং সাশ্রয়ী ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি স্বচ্ছতা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশীয় অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় গতি আনতে পারে এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে পারে, তবেই এই তীব্র হাহাকার থেকে মুক্তির পথ তৈরি হবে। রান্নাঘরের চুলা আর শিল্পকারখানার বন্ধ চাকা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আমাদের জ্বালানি নীতির সাফল্য বিচার করতে হবে। সিদ্ধান্তহীনতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুসংহত জ্বালানি
পাঠকের মন্তব্য