
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিপুল খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদায় মন্দার পাশাপাশি এবার ব্যাংকিং খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকের আইনি বিরোধ। ইনল্যান্ড বিল পারচেজ (আইবিপি) সুবিধা, ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) এবং ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে তৈরি হওয়া বিরোধ গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত। এতে দেশের অর্থঋণ আদালতগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে এ ধরনের ৭ হাজার ৩৫৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ঢাকার চারটি অর্থঋণ আদালতেই ৩ হাজার ৬৩৪টি মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে এ ধরনের মামলা শুধু আর্থিক বিরোধের চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং আন্তঃব্যাংক লেনদেনে পারস্পরিক আস্থা ও নিশ্চয়তার বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাড়ছে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের মামলা
তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের দায়ের করা মামলার সংখ্যা প্রায় ৫৭৮টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৪ সালে এ ধরনের ৭১৫টি মামলা হয়েছিল, যার সঙ্গে জড়িত ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে মামলা হয় ১ হাজার ১২৩টি, এতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর ২০২২ সালে ১ হাজার ২২৩টি মামলায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা জড়িত ছিল।
অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক আর্থিক বিরোধের কারণে আদালতে মামলা করার প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু মামলা বাড়লেও নিষ্পত্তির গতি সেই তুলনায় অত্যন্ত ধীর।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ ধরনের মাত্র ৭২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ২৬টি মামলা, যার সঙ্গে জড়িত ছিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
২৩ বছর ধরে চলা উত্তরা-সোনালী ব্যাংকের বিরোধ
ব্যাংক-ব্যাংক আইনি বিরোধের দীর্ঘসূত্রতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ উত্তরা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের মধ্যকার মামলা। প্রায় ২৩ বছর আগে, ২০০২ সালে চট্টগ্রাম টোব্যাকো কোম্পানির ইস্যু করা ৫৭টি পোস্ট-ডেটেড চেককে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সূত্রপাত।
চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান প্রাইম গ্লোবাল লিমিটেড (পিজিএল) ওই চেকগুলো উত্তরা ব্যাংকে উপস্থাপন করে ইনল্যান্ড বিল পারচেজ বা আইবিপি সুবিধা নেয়। চেকগুলো সোনালী ব্যাংকের হিসাবের ওপর ইস্যু করা হয়েছিল। প্রতিটি চেকে সোনালী ব্যাংক ‘গুড ফর পেমেন্ট’ অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে লিখিতভাবে বিষয়টি পুনঃনিশ্চিতও করে।
এই নিশ্চয়তার ওপর আস্থা রেখে উত্তরা ব্যাংক পিজিএলকে প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আইবিপি সুবিধা দেয়। কিন্তু ২০০২ সালের নভেম্বর থেকে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে চেকগুলো ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে ৫৭টি চেকই ডিজঅনার হয়।
এরপর উত্তরা ব্যাংক দাবি করে, সোনালী ব্যাংকের দেওয়া নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করেই তারা অর্থায়ন করেছিল। ফলে চেকের অর্থ পরিশোধের দায় সোনালী ব্যাংক এড়াতে পারে না।
এই বিরোধের জেরে ২০০৩ সালে প্রায় ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আদায়ের দাবিতে ঢাকার অর্থঋণ আদালতে মামলা করে উত্তরা ব্যাংক। ২০০৬ সালে মামলায় সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডিক্রি জারি হয়। পরে সোনালী ব্যাংক উচ্চ আদালতে রিট ও আপিল করলেও শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
তবে আদালতের রায় হলেও ডিক্রি বাস্তবায়ন না হওয়ায় উত্তরা ব্যাংক এখনো তাদের পাওনা অর্থ পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলা ব্যাংকগুলোর মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির একটি উদাহরণ হয়ে আছে।
কেন ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকের মামলা হয়
ব্যাংকিং খাতে আইবিপি, এলসি, ব্যাংক গ্যারান্টি, ইনডেমনিটি বা আর্থিক নিশ্চয়তার মতো বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এক ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের লেনদেন হয়।
আইবিপি হলো এমন একটি বাণিজ্যিক ঋণ সুবিধা, যার মাধ্যমে স্থানীয় এলসি বা বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে পণ্য সরবরাহের পর বিল বা প্রয়োজনীয় নথির ভিত্তিতে সরবরাহকারীকে অর্থ দেওয়া হয়।
ব্যাংকিং ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর আওতায় আইবিপি, ব্যাংক গ্যারান্টি, ক্ষতিপূরণ বা ইনডেমনিটি, এলসি এবং বিভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া দায় আদায়ের জন্য মামলা করা যায়।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংকের জন্য গ্যারান্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে। গ্যারান্টার ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করলে যে ব্যাংক অর্থ দিয়েছে, তারা পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করতে পারে।
একইভাবে, কোনো ব্যাংক লিখিত নিশ্চয়তা বা ইনডেমনিটির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের দায় নিলে এবং সেই অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
আন্তঃব্যাংক বিরোধের পুরোনো নজির
ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকের মামলার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ২০০১ সালে ভেলভেট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের পণ্য আমদানির একটি এলসিকে কেন্দ্র করে সিটি ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের ওই এলসিতে সিটি ব্যাংক ছিল ইস্যুয়িং ব্যাংক এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক ছিল নেগোশিয়েটিং ব্যাংক। পণ্য সরবরাহের পর মার্কেন্টাইল ব্যাংক বিক্রেতাকে অর্থ পরিশোধ করে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সিটি ব্যাংক সেই অর্থ ফেরত দেয়নি।
পরে পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য ২০০৪ সালে সিটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ২০০৬ সালে আদালত সুদ-আসলসহ প্রায় ৩৫ লাখ টাকা আদায়ের পক্ষে ডিক্রি দেন। পরে সিটি ব্যাংক সেই অর্থ পরিশোধ করে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ প্রণয়নের পর ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যাংকের করা এটি ছিল দেশের প্রথম মামলা।
মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি বড় উদ্বেগ
আন্তঃব্যাংক বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগা। বছরের পর বছর মামলা চলায় ব্যাংকের পাওনা অর্থ আটকে থাকছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রামের একটি মামলায় ২০১৩ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে যমুনা ব্যাংক। একজন ব্যবসায়ীর চারটি এলসির বিপরীতে গ্যারান্টার হিসেবে থাকা যমুনা ব্যাংকের প্রায় ৮ কোটি টাকা পাওনা দাবি ছিল। এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
আবার ২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখার বিরুদ্ধে মামলা করে প্রিমিয়ার ব্যাংকের গুলশান শাখা। একজন গ্রাহকের এলসি লেনদেনে গ্যারান্টর হিসেবে থাকা কৃষি ব্যাংক সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় প্রায় ৯ কোটি টাকা দাবিতে মামলাটি করা হয়। সেটিও এখনো বিচারাধীন।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ
ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের বিরোধ দীর্ঘদিন আদালতে ঝুলে থাকলে শুধু সংশ্লিষ্ট দুই ব্যাংক নয়, সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী মনে করেন, বিশ্বের অনেক দেশে ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সালিশি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। অনেক উন্নত দেশে আদালতে মামলা যাওয়ার আগেই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর পদ্ধতি অনুসরণের সুযোগ ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বাংলাদেশেও ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। পাশাপাশি কোনো ব্যাংকের কারণে আন্তঃব্যাংক বিরোধ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার বলেও মত দিয়েছেন এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দেশে সালিশি আইনের ব্যবস্থা রয়েছে।
তার মতে, এলসি নিয়ে কখনো কখনো ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিরোধ তৈরি হলেও মামলায় শুধু ব্যাংককেই বিবাদী করা হয়—বিষয়টি এমন নয়। মূল লেনদেনের সঙ্গে জড়িত পক্ষকেও মামলায় বিবাদী করা হতে পারে।
আদালতের চূড়ান্ত রায়ে কোনো ব্যাংক দায়ী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ডিক্রি জারি করা হয়। এ ধরনের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছে। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিচার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বলে জানিয়েছেন তিনি।
আস্থার সংকট কাটানো জরুরি
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার বিরোধ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আইবিপি, এলসি কিংবা গ্যারান্টির মতো আন্তঃব্যাংক লেনদেন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব লেনদেনে পারস্পরিক আস্থা ও সময়মতো দায় পরিশোধের নিশ্চয়তা না থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে।
তাই দীর্ঘমেয়াদি মামলা কমিয়ে দ্রুত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংকগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে একদিকে আদালতে আটকে থাকা বিপুল অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনাও সহজ হবে।
পাঠকের মন্তব্য