
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বিকল্প খুঁজছে বিভিন্ন দেশ। এরই মধ্যে আর্কটিক অঞ্চলের উত্তর সমুদ্রপথ বা নর্দার্ন সি রুট (এনএসআর) নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীন এই পথকে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
রাশিয়ার উত্তর উপকূল ধরে আর্কটিক সার্কেলের মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নৌপথটি বছরের উষ্ণ সময়েই মূলত চলাচলের উপযোগী। গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচলের সুযোগ বাড়ে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে চীন থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সময় সুয়েজ খালের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমানো সম্ভব হচ্ছে।
তবে সময় ও দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি এই রুটকে ঘিরে রয়েছে বড় ধরনের পরিবেশগত, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের কারণে উত্তর সমুদ্রপথ আপাতত সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি।
চীন শুরু করেছে নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রা
২০২৫ সালে পরীক্ষামূলক যাত্রার পর চীনা শিপিং কোম্পানি সি লিজেন্ড উত্তর সমুদ্রপথে নিয়মিত কনটেইনার সেবা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত সরাসরি যেতে এ পথে সময় লাগে প্রায় ১৮ দিন। একই গন্তব্যে সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে সময় লাগে ৪০ দিনেরও বেশি।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা আর্কটিক বাণিজ্যপথ এখন বাস্তব ব্যবহারের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের মতো তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে এ পথ সম্ভাবনাময় হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীন এসব পণ্যের অন্যতম বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হওয়ায় উত্তর সমুদ্রপথকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দেশটির আগ্রহও বাড়ছে।
‘পোলার সিল্ক রোড’ ধারণা চীনের
আর্কটিক অঞ্চলের এই নৌপথকে ‘পোলার সিল্ক রোড’ নামে পরিচিত করার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথমবারের মতো আর্কটিক অঞ্চলের নৌপথ উন্নয়নের বিষয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে একটি ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার কথাও তখন সামনে আসে।
উত্তর সমুদ্রপথের বড় অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক কোম্পানি রোসাটম এই পথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি ও তদারকির পাশাপাশি বরফাচ্ছন্ন সমুদ্রে চলাচলের জন্য পারমাণবিক শক্তিচালিত বরফভাঙা জাহাজ সরবরাহ করে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কোর সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ফলে আর্কটিক অঞ্চলেও চীনের উপস্থিতি ও কার্যক্রম বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতও উত্তর সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে চীনই এখন সবচেয়ে এগিয়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে নৌচলাচলের সুযোগ
উত্তর সমুদ্রপথের সম্ভাবনা বাড়ার অন্যতম কারণ আর্কটিক অঞ্চলের বরফ কমে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের বরফের পরিমাণ কমছে। এতে আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে নৌযান চলাচলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ভিন থাইয়ের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে উত্তর সমুদ্রপথ বছরের আরও বেশি সময় বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের জন্য উন্মুক্ত থাকতে পারে।
ইতোমধ্যে বরফ কমে যাওয়ার কিছু বাস্তব প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার একটি এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ মে মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আগেই যাত্রা শুরু করতে পেরেছে। একইভাবে রুশ ট্যাংকারগুলোও আগের তুলনায় উত্তর সমুদ্রপথে দ্রুত চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ কমে যাওয়া বাণিজ্যের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও এর পরিবেশগত মূল্য অত্যন্ত বেশি।
পরিবেশগত ঝুঁকি বড় উদ্বেগ
উত্তর সমুদ্রপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি। বিশেষ করে ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) ব্যবহারের কারণে আর্কটিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলে এই জ্বালানি নিষিদ্ধ করা হলেও কিছু শিপিং কোম্পানির জাহাজে এর ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন বেলোনা এনভায়রনমেন্টাল ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্কটিক অঞ্চলে ভারী জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বরফাচ্ছন্ন ও দুর্গম পরিবেশে তেল ছড়িয়ে পড়লে উদ্ধারকারী দল দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। ঠান্ডা আবহাওয়ায় তেল সহজে নষ্টও হয় না। ফলে একটি বড় দুর্ঘটনা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বনের ঝুঁকি। ভারী জ্বালানি তেল পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন এই কণা আর্কটিকের বরফ ও তুষারের ওপর জমে সূর্যের আলো শোষণ বাড়াতে পারে। এতে বরফ গলার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নিয়েও উদ্বেগ
উত্তর সমুদ্রপথে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহরের উপস্থিতিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ট্যাংকারের অনেকগুলো যথাযথ বীমা ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে পরিচালিত হয় এবং রুশ জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার অভিযোগ রয়েছে।
বেলোনার এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ উত্তর সমুদ্রপথে চলাচল করেছে, যা ওই পথে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
২০২৬ সালেও আর্কটিক অঞ্চলে এসব জাহাজের তৎপরতা বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গ্রীষ্মকালীন তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া ও কম বরফের সুযোগ নিয়ে রুশ ট্যাংকারগুলো উত্তর সমুদ্রপথে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও বড় বাধা
উত্তর সমুদ্রপথের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা। কোনো জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে দ্রুত উদ্ধার বা সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব নিষেধাজ্ঞা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া পথটির বড় অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে এই রুটের ব্যবহার নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
শুধু রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, আর্কটিক অঞ্চলের কঠিন আবহাওয়া, বরফ, সীমিত উদ্ধার অবকাঠামো এবং উচ্চ পরিচালন ব্যয়ও নৌপরিবহনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কার্বন নিঃসরণ কমার দাবি নিয়েও প্রশ্ন
সি লিজেন্ডের দাবি, চীন-ইউরোপ বাণিজ্যে উত্তর সমুদ্রপথ ব্যবহার করলে যাত্রার দূরত্ব ও সময় কমে যাওয়ায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।
তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হিসাবের সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। ভারী জ্বালানি তেল, ব্ল্যাক কার্বন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং আর্কটিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যুক্ত হলে শুধু কম দূরত্বকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।
সুয়েজ বা হরমুজের বিকল্প হবে কি?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। একইভাবে সুয়েজ খালেও বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে। ফলে চীনের মতো বড় বাণিজ্যিক শক্তির জন্য বিকল্প নৌপথের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সি লিজেন্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চীন-ইউরোপ বাণিজ্যের জন্য বিকল্প পথ তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও বিশ্ববাণিজ্যের প্রচলিত মানচিত্র পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তবে বাস্তবতা হলো, উত্তর সমুদ্রপথ এখনো সীমিত সময়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বরফ, আবহাওয়া, নিরাপত্তা, পরিচালন ব্যয়, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে এটি এখনো বড় পরিসরের বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ হয়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নও একই দিকে। আর্কটিক অঞ্চলের নৌপথ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে এটি সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নয়। বরং চীন ও রাশিয়ার জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প পথ, যার অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা আগামী কয়েক বছর ধরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য