![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা, রদবদলের আভাস বিএনপি সরকারের ছয় মাসে
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা। এতে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। পাশাপাশি মন্ত্রীপরিষদের বাইরে বিশেষ উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করা হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মসূচির সময়সীমা ১৭ আগস্ট পূর্ণ হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল, দপ্তর পরিবর্তন এবং নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
নির্বাচনের আগে তুলনামূলক ছোট মন্ত্রিসভা গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে বিএনপি। ফলে সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বড় মন্ত্রিসভা কি সরকারের কাজের গতি বাড়ায়, নাকি প্রশাসনিক সমন্বয় ও জবাবদিহিতায় জটিলতা তৈরি করে?
মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকারের জন্য ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। সেই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়নও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
কার কোন মন্ত্রণালয়ে কতটা সফলতা এসেছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় কেমন এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে মন্ত্রণালয়গুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে—এসব বিষয় মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। দপ্তর পুনর্বণ্টনের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার আকারের ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকারের মন্ত্রিসভা দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি গঠিত হয় দেশের প্রথম মন্ত্রিসভা।
১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালুর পর মন্ত্রিসভার কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে। পরে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক মন্ত্রিসভা কাঠামো কার্যকর হয়।
২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৬২ সদস্যের মন্ত্রিসভা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন সরকার তুলনামূলক বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।
অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারগুলো সাধারণত ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
মন্ত্রিসভার দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা
সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সরকারি বিল সংসদে উপস্থাপন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই মন্ত্রীদের দায়িত্ব নিতে হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের কাছে তাদের নীতিগত জবাবদিহিতাও রয়েছে।
একটি কার্যকর মন্ত্রিসভার জন্য শুধু সদস্যসংখ্যা নয়, সদস্যদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে মন্ত্রণালয়গুলোর নেতৃত্ব কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর।
বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে কেন প্রশ্ন?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, মন্ত্রিসভার আকার প্রয়োজনের তুলনায় বড় হলে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সংখ্যা মিলিয়ে বড় একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব কাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়লেও অন্যদিকে মন্ত্রিত্ব না পাওয়া সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
বড় মন্ত্রিসভা দলীয় অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় এর কার্যকারিতা নির্ভর করে দায়িত্ব বণ্টন, সমন্বয় এবং জবাবদিহিতার ওপর।
বাড়তে পারে সরকারি ব্যয়
একটি বড় মন্ত্রিসভার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে সরকারি ব্যয়। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বেতন-ভাতা ছাড়াও তাদের দপ্তর, গাড়ি, নিরাপত্তা, প্রটোকল ও প্রশাসনিক জনবল বাবদ রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা একটি দেশে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় মন্ত্রিসভা হলে সরকারি কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। সেই অর্থ জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে।
সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা
মন্ত্রিসভার আকার বড় হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্বের ওভারল্যাপ বা কাজের পুনরাবৃত্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই ধরনের বিষয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় বা দপ্তর জড়িত হলে সিদ্ধান্ত নিতে সময় বেশি লাগতে পারে।
বিশেষ করে জাতীয় সংকট, অর্থনৈতিক সমস্যা কিংবা জরুরি প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্তর বা রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘কিচেন ক্যাবিনেট’ প্রসঙ্গ
বড় মন্ত্রিসভা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হলে সরকারপ্রধানের চারপাশে একটি ছোট অনানুষ্ঠানিক পরামর্শক গোষ্ঠী তৈরি হওয়ার প্রবণতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলা হয়।
এটি কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়। সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী, উপদেষ্টা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ কাঠামো তৈরি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরামর্শ কাঠামো কার্যকর হতে পারে। তবে এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কত সদস্যের মন্ত্রিসভা কার্যকর?
মন্ত্রিসভার আদর্শ আকার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একক কোনো মত নেই। তবে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তুলনামূলক ছোট মন্ত্রিসভার সুপারিশ করেছিল। কমিশনের প্রস্তাবে ২৩ জন মন্ত্রী এবং ১২ জন প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীসহ মোট ৩৫ সদস্যের মন্ত্রিসভার কথা বলা হয়েছিল।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও ৬১টি বিভাগ রয়েছে। সংস্কার প্রস্তাবে এগুলোকে পুনর্বিন্যাস করে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে নামিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছিল।
অর্থাৎ মন্ত্রিসভার আকার কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করার একটি ধারণা সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক চিত্র
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মন্ত্রিসভার আকার এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভা তুলনামূলকভাবে ছোট। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও সাধারণত সীমিত সংখ্যক মন্ত্রী নিয়ে সরকার পরিচালিত হয়।
যুক্তরাজ্যেও মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত। অন্যদিকে জোট সরকার কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে কিছু দেশে বড় মন্ত্রিসভা দেখা যায়।
ভারতের মতো বড় জনসংখ্যার দেশেও মন্ত্রিসভার আকার বাংলাদেশের তুলনায় বড় হলেও সেখানে জনসংখ্যা, রাজ্যের সংখ্যা, প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন।
অর্থাৎ কোনো দেশের মন্ত্রিসভার আকার অন্য দেশের জন্য সরাসরি আদর্শ হতে পারে না। রাষ্ট্রের আয়তন, জনসংখ্যা, প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মন্ত্রিসভার আকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বড় মন্ত্রিসভা কি সুশাসনের অন্তরায়?
একটি সরকারের জন্য মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া। মন্ত্রীদের দক্ষতা ও সততার অভাব থাকলে ছোট মন্ত্রিসভাও কার্যকর হতে পারে না। আবার যোগ্য, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব থাকলে তুলনামূলক বড় মন্ত্রিসভাও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
তবে সদস্যসংখ্যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে গেলে সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক তোষণ, স্বজনপ্রীতি কিংবা দলীয় ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে তার প্রভাব পুরো সরকারের ওপর পড়তে পারে। একজন মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, ভুল সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধানকেই বহন করতে হয়।
দক্ষতা ও যোগ্যতাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় মন্ত্রিসভার আকার নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক। তবে শুধু সংখ্যা কমানো বা বাড়ানো নয়, বরং কোন মন্ত্রণালয়ে কী ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন—সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা গেলে মন্ত্রিসভার আকার যাই হোক, সরকার কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাই মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল শুধু রাজনৈতিক হিসাবের বিষয় নয়; এটি সরকারের আগামী দিনের কার্যকারিতা, জনআস্থা এবং সুশাসনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
জনগণের প্রত্যাশা এখন এমন একটি মন্ত্রিসভার, যেখানে পদ বা মর্যাদার সংখ্যা নয়, বরং দক্ষতা, জবাবদিহিতা, সততা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে।
পাঠকের মন্তব্য