![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ নৌ রুটের মানচিত্র নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। কয়েক সপ্তাহের কৌশলগত আলোচনার পর দুই দেশ এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
শনিবার দেফা প্রেসকে দেওয়া বক্তব্যে বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাধা সত্ত্বেও গত তিন সপ্তাহে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নৌ রুটের একটি মানচিত্র নিয়ে দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে এ অঞ্চলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো সমঝোতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর সমঝোতা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, হরমুজ প্রণালির নিরাপদ নৌ চলাচলের পথ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে গত ১৮ জুন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ওই সমঝোতার পর দুই দেশ বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু করে।
বাঘাই বলেন, গত তিন সপ্তাহের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাধা সত্ত্বেও দুই দেশের প্রতিনিধিরা জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত নৌ রুটের মানচিত্র নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি জানান, পরিকল্পনাটি তৈরির ক্ষেত্রে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও পরিবেশবিষয়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অংশ নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই নৌ চলাচলের নতুন কাঠামোর পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
এখনও কিছু বিষয় অমীমাংসিত
নৌ রুটের মানচিত্র নিয়ে সমঝোতা হলেও ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার সব বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কিছু অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাঘাই।
এর মধ্যে তেহরান ও মাসকাটের পক্ষ থেকে প্রকাশ করার কথা থাকা একটি যৌথ বা সমন্বিত বিবৃতির বিষয়ও রয়েছে। প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে যোগাযোগ ও আলোচনা চালু থাকবে।
ইরানের এই কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিরাপদ করার উদ্যোগটি ইরান ও ওমানের মধ্যকার একটি স্বাধীন চুক্তি। এর উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ইরানের আপত্তি
তবে হরমুজ প্রণালিতে পুরোপুরি নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবার শুরু করার বিষয়টি নিয়ে ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন বাঘাই।
তার দাবি, প্রণালিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড, হুমকি এবং নৌ অবরোধ বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গত দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থাৎ ইরান-ওমানের মধ্যে নৌ রুট নিয়ে সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরুর ক্ষেত্রে তেহরান বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার প্রেক্ষাপট
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের এই আলোচনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকের আওতায় শুরু হওয়া কৌশলগত আলোচনার অংশ।
ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন নৌ চলাচল কাঠামো তৈরির দায়িত্ব তেহরান ও মাসকাটকে দেওয়া হয়েছিল। সেই দায়িত্বের অংশ হিসেবেই দুই দেশ নিরাপদ নৌ রুটের মানচিত্র ও সংশ্লিষ্ট কাঠামো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে তেহরান বারবার বলে আসছে, কৌশলগত এই জলপথ পুরোপুরি পুনরায় খুলে দেওয়ার যেকোনো সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করছে, তার ওপর।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
তাই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ নৌ রুট নির্ধারণে ইরান ও ওমানের সমঝোতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে নৌ রুটের মানচিত্র নিয়ে সমঝোতা হলেও সংশ্লিষ্ট সব বিষয় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। বাকি বিষয়গুলোতে ইরান ও ওমানের আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমঝোতার বাস্তবায়নই পরবর্তী পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।
পাঠকের মন্তব্য