![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় গ্যাস গ্রিডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বেড়ে ৮১০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
শনিবার (১৫ আগস্ট) পেট্রোবাংলার জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাওয়া বিকেল ৪টার তথ্য অনুযায়ী, এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিটের এফএসআরইউ থেকে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
একই সময়ে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
যান্ত্রিক ত্রুটির পর বাড়ল সরবরাহ
গত ২১ জুলাই মহেশখালী উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হঠাৎ কমে যায়। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র হয়। পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন চালু রাখতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
পেট্রোবাংলার দৈনিক তথ্য অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৪ আগস্ট দাপ্তরিক চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ১ হাজার ৯৩১ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর আগের দিন অর্থাৎ ১২ থেকে ১৩ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৯ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট। ১১ থেকে ১২ আগস্ট সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ১০৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ১০ থেকে ১১ আগস্ট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৯৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট।
সেই হিসাবে শনিবারের ২ হাজার ৪২৫ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি নির্দেশ করছে। বিশেষ করে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজির সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে পারে গ্যাস বরাদ্দ
এদিকে চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ খাতে ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাস বরাদ্দ প্রায় ৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। তবে গ্যাসের প্রাপ্যতা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই বরাদ্দ ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য খাতের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানো এবং জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফেরানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সামিট পূর্ণ সক্ষমতায়, এক্সিলারেট এখনো পুরোপুরি নয়
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসছে দেশীয় উৎস থেকে। বাকি অংশ পূরণ করা হচ্ছে আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে।
দেশে বর্তমানে সচল দুটি এফএসআরইউ—সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির—সম্মিলিত দৈনিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে সামিটের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন এবং এক্সিলারেট এনার্জির সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমানে সামিট এফএসআরইউ থেকে প্রায় ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ সামিট প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে বর্তমানে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতার তুলনায় কম।
ফলে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর খাতে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে।
চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়
এলএনজি সরবরাহে সাম্প্রতিক উন্নতি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে কিছুটা স্বস্তি আনলেও দেশের মোট গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো সীমিত। ফলে বিদ্যুৎ, শিল্প, সার ও আবাসিকসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা পেট্রোবাংলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হলে অন্যান্য খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এ অবস্থায় এলএনজি টার্মিনালগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারলে এবং সামিটের বর্তমান সরবরাহ বজায় থাকলে সামনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সংকট কিছুটা কমতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাঠকের মন্তব্য