![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলেও দেশটির বিরুদ্ধে ‘বিজয়’ ঘোষণা করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা শিথিল করার পথও খুঁজছেন তিনি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প তার জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় সংঘাতের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করাকে সম্ভাব্য সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হতে পারেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের হিসাব
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনে পরিচালিত ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। তাঁর ধারণা, এসব স্থাপনা দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে ইরানের পক্ষে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া কঠিন হবে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, তেহরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্গঠন বা গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করলে মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারিতে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আবারও মার্কিন হামলার আশঙ্কাকে ইরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছে বলে প্রশাসনের মূল্যায়ন। এখন প্রেসিডেন্টের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
হরমুজ নিয়ে কঠোর অবস্থানে ইরান
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না তেহরানের অবস্থান। হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরান বেশ কয়েকটি কঠোর শর্ত দিয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার নীতি ও আচরণ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ, ইরানকে হুমকি দেওয়া বন্ধ, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া।
এ ছাড়া তেহরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিপুল অর্থ এবং বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ের দাবিও তুলেছে। তবে ইরানকে কোনো অর্থ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত অনাগ্রহী অবস্থান জানিয়েছেন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মাইন ব্যবহারের সক্ষমতার কারণে এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
নৌপথটিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এখন ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত উন্মুক্ত রয়েছে। তবে ইরানের অবস্থান এবং জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
‘জয়’ দেখানোর রাজনৈতিক চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবেও ট্রাম্পের সামনে চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে এবং যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় জ্বালানির দামও বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এমন একটি সমাধান খুঁজছেন, যার মাধ্যমে সামরিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে মার্কিন জনগণের কাছে এটিকে নিজের বিজয় হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হয়।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প এমন একটি নিবন্ধের লিংকও শেয়ার করেন, যার শিরোনাম ছিল—‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে জিতে গেছেন’। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াও সংঘাতকে নিজের বিজয় হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক কৌশল বিবেচনা করছেন তিনি।
তবে ইরানের নতুন শর্তগুলো সমঝোতার পথকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ক্ষতিপূরণ, সম্পদ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের বড় পার্থক্য রয়েছে।
সমঝোতার পথ কতটা খোলা?
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের কঠোর অবস্থান ট্রাম্পের জন্য সংঘাত থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ সংকুচিত করছে। অন্যদিকে তেহরান মনে করছে, হরমুজকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তাদের দরকষাকষির ক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের ধারণা ট্রাম্পও দ্রুত সংঘাতের অবসান চান। আর সেই কারণেই ইরান আলোচনায় তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ এবং জব্দ করা সম্পদ—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনো বেশ কঠিন। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের বদলে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতেই এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
পাঠকের মন্তব্য